সংস্করণ
Bangla

পুরুলিয়ার 'রোল মডেল' বাদামচাষী ফুলকুমারী

Tanmay Mukherjee
17th Nov 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

পুরুলিয়ার ধু ধু প্রান্তর। এক কোদাল মাটি কাটতেই প্রাণ যায় যায় অবস্থা। জলের জন্য মাথা কুটে মরতে হয়। সেখানেই বাদাম চাষ করে জমির প্রাণ ফিরিয়েছেন এখন ছাপোষা বধূ। সেইসঙ্গে শ্রী ফিরিয়েছেন তাঁর এবং আরও অনেক মহিলার পরিবারে। এই আশ্চর্যময়ী মহিলার নাম ফুলকুমারী মাহাতো। 

মনের অসম্ভব জোর আর পরিশ্রম ছিল পুঁজি, সঙ্গে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিকদের পরামর্শ। আর এভাবেই পুরুলিয়া জেলার ২ নম্বর ব্লকের এক স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কয়েকশো সদস্যা বাদাম চাষ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠলেন।

image


পুরুলিয়া শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে আগোয়া-আনাড়া এলাকা। বিঘের পর বিঘে জমি এখানে অনাবাদী। লাল কাঁকুড়ে মাটি। তাই বৃষ্টি হলেও এক ফোঁটা জল থাকে না। নিজেদের জমি নিয়ে একসময় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন ‌ভূমিপুত্ররাই। তাই বাইরে গিয়ে কাজ বা পুরুলিয়া শহরে নানারকম কাজ করেই তাদের কোনওক্রমে পেট চলত। জমির সঙ্গে গৃহকর্তা দূরত্ব রাখলেও অন্যরকম কিছু ভেবেছিলেন ফুলকুমারী মাহাতো। খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন এমন জমিতে বাদাম দারুণ ফলবে। অল্প জলে কাজ হবে, আবার খুব বেশি খাটতে হবে না। কিন্তু গেঁয়ো যোগীর কথা প্রথমে অনেকেই শোনেননি। বন্ধ্যা জমিতে চাষ। এই কথা বোঝাতে গিয়ে ফুলকুমারীকে অনেক কথা শুনতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত নিজেই জমিতে কোদাল নিয়ে নেমে পড়লেন। তারপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। সোনা ফলল রীতিমত। 

image


মাত্র চার মাসেই বাদাম হল। হেঁশেলের কাজ সেরে জমির দিকে একটু নজর দিতেই অসাধ্যসাধন। আর এখন এই পথে হাজির অজস্র ফুলকুমারী। পুরুলিয়া ২ ব্লকের বহু বধূই এখন সংসার সামলে বাদাম চাষে মন দিয়েছেন। সংগঠিতভাবে বাদাম চাষের জন্য ডুমুরডি সোনার বাংলা মহিলা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। এই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা বুঝে গিয়েছেন বাদাম চাষ করলে আর অন্যের মুখাপেক্ষী থাকতে হবে না। সংসারে হাসি বজায় থাকবে।

ফুলকুমারীদের এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রধান বাধা ছিল প্রকৃতি। লড়াইটা বেশিদিন একপেশে হয়নি। এবার টানা বৃষ্টিতে যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা রাজ্যের অন্যান্য জেলায়, তখন এই বৃষ্টিই আর্শীবাদ হয়েছে পুরুলিয়ায়। ফুলকুমারীদের বাদাম গাছগুলোও ভাল বেড়েছে। এবার এক বিঘেতে ৮ কেজি বীজ বুনে প্রায় ২ কুইন্টাল ফলন হয়েছে। ৮ কেজি বীজের জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় ৪০০ টাকা। সেখানে বাদাম বিক্রি করে হাতে এসেছে ৬ হাজার টাকা।

image


ভাল ফলন হলেও চিন্তায় ছিলেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা। কারণ তাঁদের থেকে ২০ টাকা কেজিতে বাদাম কিনে ব্যবসায়ীরা কম করে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করতেন। মধ্যসত্বভোগীদের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনির পর সেভাবে দাম না পেলে আর কার মন ভাল থাকে। এবারের বৃষ্টির মতো ওই যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছে কল্যাণীর বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিবিদরা। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজ্যের কৃষি দফতরের আধিকারিকরা সম্প্রতি ওই এলাকায় যান। প্রযুক্তির সাহায্যে আরও কীভাবে বেশি উত্পাদন করা যায় সে ব্যাপারে ফুলকুমারীদের পরামর্শ দেন তাঁরা। পাশাপাশি বিপণনের ব্যাপারটিও বোঝানো হয়। বাদামের বীজ সংরক্ষণের ব্যাপারেও তাদের পরামর্শ দেওয়া হয়।

এই ব্যাপারে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন গবেষণা অধিকর্তা ডঃ অরবিন্দ মিত্র বলেন, রাজ্যে বোরো ধানের চাষে সেভাবে দাম না পাওয়ায় অনেকেই বাদাম চাষে ঝুঁকেছেন। তাই চাষের এলাকা বাড়ছে। কিন্তু এক্ষেমত্রে সমস্যা হল বাদাম বীজ জোগানের। রাজ্যে বাদাম বীজের জোগান খুবই কম। ভিনরাজ্য থেকে বাদাম বীজ আনতে হয়। এই অবস্থায় রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল বিশেষত, পুরুলিয়ার টাড় অঞ্চলে খারিফ মরসুমে বাদাম চাষ করে রবি মরসুমে বাদাম বীজের জোগান দেওয়া যেতে পারে। বাজার বাড়ছে জানতে পেরেছেন ফুলকুমারী মাহাতোরা। তাই এখন থেকেই সামনের মরসুমের জন্য তারা তৈরি।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags