সংস্করণ
Bangla

প্রাচীন শিল্পকে হাতিয়ার করেই লড়ছেন লাভলি বিবি

sananda dasgupta
1st Jan 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

জন্ম বীরভূম জেলার নানুরের গ্রামে, পড়াশোনার সুযোগ প্রায় ছিলই না। প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করার আগেই বন্ধ হয়ে যায় পড়া। তারপর বছর ১৪ এর মধ্যে বিয়ে, তিন কন্যা সন্তানের জন্ম। স্বামী ছিলেন সামান্য বেতনের সরকারি কর্মচারী। এভাবেই আর পাঁচটা মেয়ের মতোই চলছিল লাভলি বিবির জীবন। কিন্তু এরই মধ্যে বাধ সাধল ভাগ্য। মানসিক রোগের শিকার হওয়ায় চাকরি খোয়াতে হল স্বামীকে। দোষ বর্তাল লাভলির ওপর। গ্রামীণ সমাজ তাঁকে চিহ্নিত করল অপয়া হিসেবে, একঘরে করল পরিবারটিকে। বের করে দেওয়া হল শ্বশুরবাড়ি থেকে। বন্ধ হল মেয়েদের পড়াশোনা। স্বামীর সামান্য পেনশনের টাকায় দুবেলার অন্ন সংস্থানই হয়ে উঠল অসম্ভব। আর ঠিক সেখান থেকেই শুরু হল এক অন্য উত্তরণের গল্প। মা দিদিমার থেকে ছোট বেলাতেই শিখেছিলেন কাঁথা সেলাই, এই এলাকার প্রতিটি ঘরের মেয়েই যা শিখে থাকে, সেই কাঁথাকেই লড়াইয়ের হাতিয়ার করে নিলেন লাভলি।

image


“মেয়েদের দুবেলা দুমুঠো খেতে তো দিতে হবে, স্বামীর ওষুধ, ডাক্তার। এখানেই স্থানীয় এক দিদির থেকে কাজ নিতে শুরু করি। সে কাপড়, সুতো, ডিজাইন সব দিয়ে দিত, আমি শুধু সেলাই করে দিতাম। টাকা পেতাম সামান্যই কিন্তু কি করব, আমি তখন কাউকে চিনি না, বোলপুরও আমার কাছে তখন বিদেশ। সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়”, বলছিলেন লাভলি।

নিজের সেলাই থেকে রোজগারের টাকা দিয়েই মেয়েদের আবার স্কুলে ভর্তি করেন লাভলি। এরই মধ্যে একটু একটু করে তৈরি করেন যোগাযোগ, যাতায়াত শুরু করেন বোলপুরে, সরাসরি বোলপুরের দোকানে কাঁথা স্টিচের জিনিস দিতে শুরু করেন।

“আমি পড়াশোনা করতে পারিনি, আমাদের সমাজে সে চলই ছিল না, কিন্তু মেয়েগুলো পড়ুক, নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছি পড়াশোনা জানাটা কত দরকার। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, মেজ মেয়ে কলেজে পড়ছে, ছোটটাও স্কুল যায়”, উজ্জ্বল মুখে জানালেন বছর ৩৫ এর লাভলি বিবি।

এরই মধ্যে ইউনেস্কো ও এমএসএমই এন্ড টি দফতরের উদ্যোগে এই এলাকার কাঁথা শিল্পীদের নিয়ে একটি প্রজেক্ট শুরু হয়, যুক্ত হন লাভলিও, খুলে যায় এক নতুন জগৎ। 

“বোলপুরে গেলেও তার বাইরে যাওয়ার সাহস কোনোদিন হয়নি। তাছাড়া পুঁজিও ছিল না, ফলে নিজের থেকে ব্লাউস পিস বা ওরকম ছোট জিনিস ছাড়া কিছু বানাতে পারতাম না, বাকি অন্য জিনিসের জন্য ভরসা ছিলেন মহাজনরাই, এতে শিল্পীর আয় খুব বেশি থাকে না। এই প্রজেক্টে যুক্ত হওয়ার পর নানা প্রশিক্ষণ পাই, নতুন ধরণের ডিজাইন তুলতে শিখি। কলকাতা এমন কী বাইরের অনেক শহরের দোকানগুলির সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি হয়”, বললেন লাভলি।

এর পাশাপাশি ব্রিটিশ কাউন্সিলের উইমেনস অ্যাঁন্ত্রপ্রনয়্যারশিপ ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামেও যোগ দেন লাভলি। স্বল্প পুঁজি ও নিজের শৈল্পিক দক্ষতাকে সম্বল করে কীভাবে ব্যবসা গড়ে তুলতে পারবেন শিখে নেন সেই খুঁটিনাটি।

image


লাভলির পাশাপাশি তাঁর মেয়ে রিণিও নিয়েছে প্রশিক্ষণ, শাড়িতে, কাপড়ে কাঁথা এমব্রয়ডারির ছাড়াও কাঁথার কাজের অসাধারণ সব গয়না বানায় রিণি। কলেজের পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের কাজে সাহায্য করে সে। ভবিষ্যতে চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোই লক্ষ্য তার।

ইতিমধ্যেই নিজের শিল্প সম্ভার নিয়ে গোয়া, দিল্লি ইত্যাদি শহরে প্রদর্শনী করে এসেছেন লাভলি। বিভিন্ন শহরের নানা দোকানে নিয়মিত শাড়ি, স্টোল, সালওয়ার কামিজ ইত্যাদি সরবরাহ করেন তিনি।

একদিনের ভীতু, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে প্রত্যাখ্যাত লাভলি আজ এক আত্মবিশ্বসী, প্রত্যয়ী, সাবলম্বী নারী। কাঁথার কাজের পাশাপাশিই গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে আর্জি জানিয়ে স্থানীয় এক স্কুলে মিড-ডে মিল রান্নার দায়িত্বও পেয়েছেন লাভলি।

যে লাভলি একদিন ঘরের বাইরে পা রাখতে ভয় পেতেন তিনিই আজ চষে ফেলছেন কলকাতা, দিল্লি, গোয়ার মতো শহর, বুঝে নিচ্ছেন নিজের হিসেব। সূঁচ সুতোতে এঁকে দিচ্ছেন নিজের স্বপ্ন, সন্তানদের স্বপ্ন।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags