সংস্করণ
Bangla

সাপ সচেতনতায় মিন্টু চৌধুরীর ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’

Tanmay Mukherjee
27th Oct 2015
Add to
Shares
4
Comments
Share This
Add to
Shares
4
Comments
Share

কারও বাড়ি বা মুরগি খামারে সাপ ঢুকেছে। রাতবিরেতে ডাকলেও তিনি বিরক্ত হন না। হাতে একটি লোহার দণ্ড নিয়ে সেখানে হাজির হয়ে যান ষাটোর্ধ্ব। স্রেফ ফোঁস ফোঁস আওয়াজ শুনেই বুঝে যান কোথায় ঘাপটি মেরে আছে গোখরো। এরপরই শুরু হয়ে যায় অকুতোভয় মানুষটির কেরামতি। স্রেফ লোহার দণ্ড বা ক্যাচার দিয়ে কয়েক মুহূর্তের বের করে আনেন প্রায় সাত ফুট দৈর্ঘ্যের বিষধর সাপটিকে। একটু এদিক-ওদিক হলে এক ছোবলেই সব শেষ হয়ে যেতে পারত। কিন্তু সাপকে বাগে আনার অদ্ভুত ক্ষমতাই মিন্টু চৌধুরীকে এই আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। জলপাইগুড়ি ধুপগুড়ির এই ছাপোষা মানুষটি দণ্ড দিয়ে সাপের একটা অংশ ধরেন, লেজ হাত দিয়ে ধরেন। কারণ তিনি জানেন যন্ত্রের বেশি চাপ পড়লে সাপটির ক্ষতি হতে পারে। তাঁর ‘হাতযশে’ এভাবে কয়েক হাজার সাপ জীবন পেয়েছে। সাপ শুধু উদ্ধার করা নয়, সাপ যে আমাদের শত্রু নয় তা বোঝানোর কাজ গত চল্লিশ বছর ধরে নীরবে করে চলেছেন তিনি।

image


ষাটের দশকের শুরুর দিকের কথা। মিন্টু চৌধুরী তখন স্কুলে পড়তেন। তাঁর সঙ্গে তখন দারুণ হৃদ্যতা ছিল শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের। দুই বন্ধু একসঙ্গে খেলতেন, পড়াশোনা করতেন। একদিন মিন্টুবাবু শুনলেন সাপের কামড়ে তাঁর প্রিয় বন্ধু শঙ্কর মারা গিয়েছেন। শঙ্করকে বাঁচানোর জন্য নাকি অনেক ঝাড়-ফুঁকও হয়। কিন্তু কিছুতে কাজে আসেনি। বন্ধুর অকালমৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিল শিশুমনকে। মাঠাঘাটে ঘোরা মিন্টুবাবুর পর্যবেক্ষণ ছিল সাপকে বিরক্ত না করলে তো কাউকে কিছু করে না। তাহলে কেন এমন হল। সেই থেকে শুরু হল সাপকে আরও ভাল করে জানা, চেনার কাজ। ১৯৬৭ সালে প্রথম সাপ ধরা শুরু করলেন মিন্টু চৌধুরী। একটি সাপকে নিরীহ ভেবে নিয়ে এসেছিলেন বাড়িতে। বাবার কাছে জানতে পারেন সাপটি শাখামুটি, যা বিষধর। কিন্তু মিন্টুবাবু বাড়ির একটি গাছের মধ্যে শাখামুটিকে রেখে পরম নিশ্চিন্তেই ছিলেন। সেই থেকে তাঁর বিশ্বাস দৃঢ় হয় সাপকে বিরক্ত করলে বা তার কোনও কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ালে সে যতই বিষ নিয়ে থাকুক একটুও ঢালবে না।

image


আট ভাই-বোনের বড় সংসার। কিছুটা অস্বচ্ছলতার কারণে বেশি দূর পড়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সাপ নিয়ে আগ্রহতে এতটুকু ভাঁটা পড়েনি। পাড়া, গ্রামে সাপকে উদ্ধার করে শুশ্রুষা করেই ক্ষান্ত হননি। সাপের সম্পন্ধে আরও জানতে তখন তাঁর একমাত্র ভরসা ছিল ‘ইন্ডিয়ান স্নেক গাইড’ নামের একটি বই। বই পড়ে কিছুটা স্বশিক্ষিত হন মিন্টুবাবু। তারপর নিজের উদ্যোগেই স্কুল, কলেজ বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে শুরু করেন সাপ নিয়ে সচেতনতা শিবির। কোনও সাপ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হলুদ গুঁড়ো দিয়ে যত্ন নেওয়া, কিংবা ওষুধ, তুলো দিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দেওয়া এসব চলতে থাকে সমান তালে। স্কুল, কলেজের পড়ুয়াদের তিনি বোঝাতে থাকেন সাপ মানুষের শত্রু নয়, বন্ধু। শুধু বিপদে পড়লে সাপ ছোবল তোলে। দাঁড়িয়ে থেকে জিনিস সাপ বুঝতে পারে না, কিছু নড়াচড়া করলেই তার যত দৌরাত্ম্য। তাঁর সাপ ধরার কায়দা অনেকের কৌতুহল বাড়ালেও এই পদ্ধতি অনুকরণ করতে বারণ করেন মিন্টুবাবু। কারণ সাপ ধরতে গেলে কিছু বিশেষ ধরনের কায়দার প্রয়োজন। সাপ সম্পর্কে সচেতন করতে গিয়ে বানারহাট হাইস্কুলে একটি বোরা সাপ তাঁর বাঁ হাতে কামড়ে দেয়। খোদ ট্রেনারের হাল দেখে অনেকেই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। বিষয়টি এতটুকু ভ্রূক্ষেপ না করে মিন্টুবাবু বুঝিয়ে দেন কীভাবে সাপের বিষ শরীরে ছড়ায়। বেশি উত্তেজিত হলে রক্ত‌ সংবহনের মাধ্যমে তা আরও শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর জন্য তিনি নিজেই বাঁ হাতের একটি অংশ বেঁধে দেন। ওই অবস্থাতেই নিজেকে দিয়ে বোঝাতে থাকেন কীভাবে সাপে কামড়ালে ধীরে ধীরে কামড় খাওয়া অংশ আস্তে আস্তে ফুলে যায়। অকুতোভয় ভাব দেখালেও স্কুলের শিক্ষকরা আর ঝুঁকি নেননি। মিন্টুবাবুকে পাঠিয়ে দেন জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে। বহরমপুরে এক কৃষি প্রদর্শনীতে গিয়ে অনেকটা এরকম অবস্থা হয়েছিল। কিন্তু মিন্টুবাবু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বিপদ কিন্তু সম্ভাবনা তৈরি করে।

image


কার্য‌ত ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। মাঝেমধ্যে সাপের কামড়ও খেতে হয়। এই সব করতে গিয়ে পরিবারের থেকে প্রথম দিকে পিছুটান ছিল। বাড়ির লোকজন পরে বুঝতে পারেন মানুষটির হৃদয়ে অনেকটা জায়গা করে নিয়ে আছে সরীসৃপরা। তাই পরিজনরাও এখন সাপ সম্পর্কে সচেতন করতে মিন্টুবাবুর মিশনে প্রবলভাবে পাশে রয়েছেন। মিন্টুবাবুর এক ছেলে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরে যান। অসম, বিহার, উত্তর প্রদেশ এমনকী নেপাল, ভূটান থেকেও ডাক পান মিন্টুবাবু। ৬২ বছরের মানুষটির কথায়, তরাই-ডুয়ার্সে বেশ কিছু সাপ এখন লুপ্তপ্রায়। নানারকম রাসয়ানিক প্রয়োগ এবং জঙ্গলের ভিতর আগুন লাগিয়ে দেওয়ায় সাপেদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। পাশাপাশি বসতি বাড়তে থাকায় সাপেদের জীবন এখন ওষ্ঠাগত। তাই এত সাপ বের হওয়ার ঘটনা। প্রতি জেলায় যদি একটি করে স্নেক রেসকিউ সেন্টার তৈরি করা হয় তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাবে বলে তিনি মনে করেন।

image


নব্বই এর দশকেও জলপাইগুড়ি এবং উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে বন দফতরের উদ্যোগে সাপ সম্পর্কে সচেতনতা শিবির নিয়মিত হত। যেখানে প্রচারের মুখ হতেন মিন্টুবাবু। আগে পুজো মণ্ডপগুলিতেও সাপ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটাতেন তিনি। কিন্তু নানা কারণে গত কয়েক বছর ধরে তা বন্ধ। এখন নিজের উদ্যোগে স্কুল, কলেজে যান মিন্টুবাবু। এর পিছনে তাঁর দুটি উদ্দেশ্য থাকে। এক, সাপকে যাতে সুস্থ অবস্থায় জঙ্গলে ফেরানো যায়, তাহলে বাস্তুতন্ত্র ঠিক থাকবে। দ্বিতীয়ত, তিনি নিশ্চিত করতে চান মানুষ যেন আতঙ্কের বশে সাপেদের যেন না মারে। ডুয়ার্সের প্রকৃতিপ্রেমী হিসাবে পরিচিত রাজ বসুর সংস্থা হেল্প ট্যুরিজমের মাধ্যমেও মিন্টু চৌধুরী অনেক জায়গায় এধরনের কাজ করেন।

ধুপগুড়িতে মিন্টু চৌধুরীর বাড়িতে মাঝেমধ্যেই বেশ কিছু অসুস্থ সাপ থাকে। তাদের ইঞ্জেকশন এবং ওষুধ দিয়ে সেবা করার চেষ্টা করেন ষাটোর্ধ্ব। সুস্থ হলে মরাঘাট রেঞ্জ ও বিন্নাগুড়ি ওয়াইল্ড লাইফের কর্মীদের কাছে সাপগুলিকে তুলে দেন তিনি। তোতাপাড়া জঙ্গল হয় তাদের ঠিকানা। সাপেদের পুনর্বাসন নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু করলেও ইদানীং বন দফতরও সেভাবে সহযোগিতা করেন বলে খেদ রয়েছে মিন্টুবাবুর। তবে কোথাও সাপের খবর পেলে সেই আক্ষেপ চলে যায়। যথন দেখতে পান তার দেখানো পথে নতুন প্রজন্ম সাপ না মেরে বন দফতরের হাতে তুলে দিচ্ছে, তখন মনে হয় লড়াইটা আর অসম নেই। আসলে ফোঁস ফোঁস শব্দ যে তাঁকে টানে। চার দশকের বেশি সময় ধরে সেই দুর্নিবার আকর্ষণই তাঁকে এই জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে।

Add to
Shares
4
Comments
Share This
Add to
Shares
4
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags