সংস্করণ
Bangla

গাড়ি চালিয়ে কলকাতা থেকে লন্ডন ছুটবেন দুই বাঙালি উদ্যোগপতি

7th Jan 2017
Add to
Shares
3.9k
Comments
Share This
Add to
Shares
3.9k
Comments
Share
কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে একথা এক কবি অনুমান করেছিলেন। আরও একজন বলেছিলেন কলকাতাকে লন্ডনের মতো সুন্দরী করে তুলবেন সদিচ্ছার ম্যাজিক দণ্ডের ছোঁয়ায়। কিন্তু কলকাতা আছে কলকাতাতেই।

এবার আসি দুই বন্ধুর গল্পে। যারা কলকাতাকে জুড়ে দিতে চাইছেন লন্ডনের সঙ্গে। হাওড়া ব্রিজ থেকে লন্ডন ব্রিজ পর্যন্ত একটা গাড়ি নিয়ে ছুটবেন। পথে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবেন মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, চীন, রাশিয়া, কাজাখিস্তান, চেক রিপাবলিক, বেলজিয়াম, জার্মানি, ফ্রান্স হয়ে লন্ডন ব্রিজ। শুনে মনে হতে পারে হযবরল-র রানাঘাট থেকে তিব্বত যাওয়ার রাস্তার কথা বলা হচ্ছে, আসলে এটাই তনুশ্রী নন্দন এবং সমরেশ দাশের লন্ডন ব্রিজ যাওয়ার রুট ম্যাপ।

image


ওরা আগামী এপ্রিলে যাত্রা শুরু করছেন। দুমাস টানা গাড়ি চালিয়ে যাবেন লন্ডন। মাথাপিছু খরচ পড়বে ষোলো লাখ টাকার একটু বেশি। সমরেশের ইকোস্পোর্টস গাড়িটাই ছুটবে এই সতের হাজার কিলোমিটার। ভাবছেন তো এত কিছু থাকতে হঠাৎ এরকম অভিযানের কারণ কী। জিজ্ঞেস করেছিলাম। বিশ্বাস করুন, ওদের একটা উদ্দেশ্য আছে। অভিযানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে জানালেন পেশায় আইনজীবী তনুশ্রী নন্দন। বলছিলেন, দুনিয়ায় হাজার সাতেক বিরল রোগের উল্লেখ আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায়। কিন্তু তার সম্পর্কে লোকজন কিছুই প্রায় জানেন না। অনেক ক্ষেত্রে বিরল রোগের চিকিৎসারও ব্যবস্থা নেই। এই ভূভারতে কোনও কোনও অসুখ শুধু মাত্র একটি হাসপাতালে চিকিৎসা হয়। কোনও কোনও অসুখের চিকিৎসারই ব্যবস্থা নেই। অনেক সময় চিকিৎসকরাও অনুমান করতে পারেন না যে তিনি একটি বিরল রোগের চিকিৎসা করছেন। বিরল রোগ নিয়ে সচেতনতার প্রচুর অভাব রয়েছে। আর এই ছবিটা শুধু ভারতের মানচিত্রে আটকে আছে তাই নয়, গোটা বিশ্বেই বিরল রোগ নিয়ে সচেতনতা কম। তনুশ্রী এবং সমরেশ গোটা পৃথিবী ঘুরে ঘুরে মানুষকে সচেতন করবেন। এই অসাধ্য সাধন করার ইচ্ছেটা আরও প্রাণ পেয়েছে ORDI নামে একটি সংস্থার দৌলতে। অর্গানাইজেশন ফর রেয়ার ডিজিজ অফ ইন্ডিয়া ওদের এই অভিযানের অন্যতম প্রেরণা। বিশ্বের অলিতে গলিতে ওআরডিআইয়ের কথা বলবেন ওরা। বিনিময়ে ওআরডিআই ওদের এই অভিযানে বিরল রোগ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে।

তনুশ্রী নন্দন। এর সম্পর্কে আগেও শুনেছেন আপনারা। তনুশ্রী একটি স্টার্টআপের কোফাউন্ডার। লেম্যানস লইয়ার। শঙ্খশুভ্র কুণ্ডুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনলাইন আইনি পরিষেবা দেওয়ার একটি অনন্য স্টার্টআপ আছে তনুশ্রীদের। পাশাপাশি উদ্যোগী তনুশ্রী সমরেশ দাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানিও চালান। সংস্থার নাম রেড অ্যান্ট।

image


আর সমরেশ ইওরস্টোরি বাংলার নবতম আবিষ্কার। হুগলী ও বাকুড়া সীমান্তের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম দারাপুরের ছেলে সমরেশ। ছোটবেলা থেকেই জীবনটাকে দক্ষ ড্রাইভারের মতো চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন কোনও এক অভিযানে। একথা বলার কারণ আছে। ওর কাহিনিটা শুনলে আপনিও বুঝবেন কেন একথা বলছি।

ওর ছোটবেলার দারাপুর এমন একটা গ্রাম, যেখানে বিদ্যুতের তার পৌঁছায়নি। চাষাবাদের জন্যে জমি নেই এমন একটি পরিবারের ছেলে সমরেশ। বাবা কলকাতার ছাপাখানায় কাজ করতেন। মাসে বাড়িতে কষ্টে শিষ্টে মাত্র ৯০০ টাকা পাঠাতে পারতেন। তাই দিয়ে তিন বোন দুই ভাই আর মায়ের চলত। তাই দিয়েই সকলের পড়াশুনো আর দুবেলা দুমুঠোর জোগাড় করতে হত। ফলে জীবন অতি সরল রেখায় চলছিল না। বাড়ি থেকে সদরে আসতে হত সরু মাটির আঁকা বাঁকা রাস্তা ধরে, কোথাও উঠছে তো পরক্ষণেই নেমে যাচ্ছে নীচে। এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে সদর, হাট, টপকে টপকে চলছিল জীবন। অনেক কষ্টে দেড়শ টাকায় একটা সাইকেল জোগাড় করতে পেরেছিলেন সমরেশ। সেদিন প্রথম গতির স্বাদ পেলেন বাড়ির বড় ছেলে। অনেক বড় হওয়ার গোপন স্বপ্নটা ছিলই। পাশাপাশি ছিল শহরে আসার প্রবল বাসনা। লেখাপড়ায় বেশ ভালো। তাই কলেজে পড়তে চলে এলেন কলকাতায়। সারাদিন একটি কেবল টিভির দফতরে ফাইফরমাশ খাটতেন, রাতে কলেজ করতেন, ইংরেজি অনার্সের ক্লাস। রাজা রামমোহন রায় সরণীর আনন্দমোহন কলেজ থেকে লেকটাউন পর্যন্ত প্রায়ই পায়ে হেঁটে যেতে হয়েছে।এখনও মনে আছে সেদিন ওর মাইনে ছিল হাজার টাকারও কম। কিন্তু ওই যে দেড়শ টাকায় কেনা সাইকেল টা ওকে গতির স্বাদ দিয়েছিল, তাই এগোনোর ইচ্ছেটা ওকে তাড়া করত।

ঢুকে পড়লেন আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কে। ক্রেডিট কার্ড বিক্রি করার কাজে। কোনও মতে ভদ্রস্থ এক সেট জামা প্যান্ট জোগাড় করে শুরু হল চাকরি করা। সামনে লক্ষ্য স্থির করে দিলেই নিমেষে টপকে ফেলতেন সেই লক্ষ্যমাত্রা। এগোতেন তরতর করে। সহকর্মীদের থেকে অনেক অনেক যোজন এগিয়ে থেকেছেন চিরকাল। কাজই ওকে আরও ভালো কাজে যুক্ত করেছে। পেশাদারিত্বের পুরস্কার পেয়েছেন সমরেশ। প্রোমোশনের পর প্রোমোশন ওকে পৌঁছে দিয়েছে এমন এক জায়গায় যেখানে ওর অধীনে একের পর এক রিজিওন। এক সময় গোয়া এবং কর্নাটক দু-দুটো রাজ্যের ব্যাংকিঙয়ের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।

আরও দ্রুত দৌড়তে গিয়ে হোঁচটও খেয়েছেন সমরেশ। কাজের সূত্রে বেঙ্গালুরুতে কাটিয়েছেন দীর্ঘদিন। চাকরি ছেড়ে স্টার্টআপ শুরু করার চেষ্টায় ছিলেন। কেউ একজন বিনিয়োগ করবেন ঠিক ছিল। কিন্তু হঠাৎ রিসেশনের মুখে পড়ে ভেস্তে গেল জল্পনা। ততক্ষণে প্রায় পৌনে তিনলাখ টাকার মাসমাইনের চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু মুখ থুবড়ে পড়ে থাকেননি। পড়ে থাকার পাত্রও তিনি নন। উদ্যোগপতি হওয়ার চেষ্টায় ফিরে এসেছেন কলকাতায়। তখন ওর একটা অল্টো গাড়ি ছিল। বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতা। টানা গাড়ি চালিয়ে চলে এসেছিলেন সমরেশ। গাড়ির স্টিয়ারিংটাই ওকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। কলকাতায় ফিরে একের পর এক প্রকল্পে কাজ করেছেন। শুরু করেছেন রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা। সাফল্যের শীর্ষ ছুঁয়ে দেখার স্বাদও পেয়েছেন সমরেশ। সমরেশ শব্দের অর্থ যুদ্ধের দেবতা। তাইই এজীবনে প্রমাণ করছেন বছর আটত্রিশের যুবক।

বলছিলেন, ওই চলৎশক্তিহীন গ্রামটায় যখন থাকতেন, যখন প্রথম সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেলটা কিনতে পারলেন তখন তিনি স্বপ্ন দেখতেন একদিন গোটা দুনিয়াটা ঘুরে দেখবেন। আর আজ তাই আক্ষরিক অর্থেই গোটা দুনিয়াটা তাঁর নিজের গাড়িতে চড়ে ঘুরে দেখছেন সমরেশ। ইতিমধ্যেই আইসল্যান্ড ঘুরে এসেছেন। গোটা ইউরোপ ঘুরেছেন ড্রাইভ করে। আলাস্কা গিয়েছেন। এবার প্রায় গোটা এশিয়া মহাদেশ অতিক্রম করে লন্ডন ব্রিজ পর্যন্ত যাচ্ছেন। স্বপ্ন দেখছেন একদিন অ্যান্টার্কটিকাও যাবেন।

"ঝুঁকি আছে। কিন্তু ঝুঁকি নেওয়াটা তো উদ্যোগপতির জিনেই থাকে।" অস্থির সমরেশ ঘরে যখন থাকেন তখন একমাত্র স্থিরতা পান তার সন্তান সুনয়ের সামনে দাঁড়িয়ে। যেন সমস্ত যাত্রা কোথাও মানে পায়।

Add to
Shares
3.9k
Comments
Share This
Add to
Shares
3.9k
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags