সংস্করণ
Bangla

দানধ্যানে মন নেই কেন ভারতীয়দের ? উত্তরটা জানেন প্রেমজি

YS Bengali
12th Jan 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

আর্ট অফ গিভিং। এমন বাক্যাংশ কী কেউ কখনও শুনেছেন ? সম্প্রতি মেয়ের জন্মের খুশিতে ফেসবুকের ৯৯ শতাংশ শেয়ার দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্ক জুকেরবাগ। নিন্দুকেরা তাঁর এই ঘোষণার পিছনে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিসন্ধি খুঁজছেন। তাঁদের জন্য বলে রাখা ভাল যে গোনাগুন্তি হলেও এমন মানুষের নজির রয়েছে একাধিক। যেমন ওয়ারেন বাফে কিংবা বিল গেটস। ভারতীয়দের মধ্যে গুটি কয়েক যাঁরা এমন উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁদের অন্যতম নাম আজিম প্রেমজি।


image


১৯৯৯ সালে তিনি গড়ে তোলেন আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশন। উইপ্রোর ৪০ শতাংশ শেয়ার দান করেন অলাভজনক ট্রাস্টে যার মূল্য ৫২ হাজার কোটি টাকা। গত ২ বছর ধরে সমাজসেবামূলক কাজে উৎসাহ দিতে নিজের মতো করে প্রচার শুরু করেছেন প্রেমজি।

প্রেমজির মতে, মূলত দুটি কারণে দেশের বিত্তশালী সমাজ দানধ্যানে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন আমেরিকা থেকে। প্রথমত, সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারার ক্ষেত্রে তাঁদের পরিবার অনেক বিস্তৃত হয়। দ্বিতীয়ত বেশিরভাগ উচ্চবিত্তই মনে করেন, তাঁদের সম্পত্তির ওপর একমাত্র অধিকার রয়েছে তাঁদের সন্তান সন্ততির।

আইআইএম ব্যাঙ্গালোরের অ্যালুমনাই মিটে কিরণ মজুমদার শ অকপটে বললেন, যদি তিনি প্রেমজির জীবনি লেখেন, তবে তাঁর নাম দেবেন ‘গিভিং ইট অল ’। কিরণ আর প্রেমজি‍র কথোপকথনের নির্যাস তুলে ধরল ইওরস্টোরি।


image


কিরণ মজুমদার শ- ছোটবেলা থেকেই কি সমাজসেবামূলক কাজ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ? কোনও বিশেষ ঘটনা কি আপনাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল ?

আজিম প্রেমজি – আমার মা‍-ই আমাকে এ ব্যাপারে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। তিনি চিকিৎসক ছিলেন। কিন্তু কোনওদিন প্র্যাকটিস করেননি। বম্বে অধুনা মুম্বইতে তিনি পোলিও ও সেরিব্রাল পলসি-তে আক্রান্ত শিশুদের জন্য একটি অর্থোপেডিক হসপিটাল গড়ে তোলেন। ২৭ বছর বয়স থেকে ৭৭ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি ওই হাসপাতালেরই চেয়ারপার্সন ছিলেন। সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল ছিল এই হাসপাতাল যা কখনওই সময়ে আসত না। তাই সারাজীবন ধরেই হাসপাতালের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে গিয়েছেন আমার মা।

কিরণ মজুমদার শ- আপনি বরাবরই মিতব্যয়ী বলে পরিচিত। কোনওদিন পাঁচ তারা হোটেলে ওঠেননি। দামি গাড়ি চড়েননি। স্টেটাস সিম্বলের যাবতীয় ট্যাবু ভেঙেচুরে দিয়েছেন। আপনার জীবনে এমন কোনও ঘটনা ঘটেছে যা আপনাকে এভাবে অর্থদানে উদ্বুদ্ধ করেছে ?


image


আজিম প্রেমজি- ভারতে দারিদ্র আর আর্থিক বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। সমাজের একটা বড় অংশ অবহেলিত। তাই এমন সিদ্ধান্ত।

কিরণ মজুমদার শ- কথায় বলে, ধন আর জ্ঞান ভাগ করলে বাড়ে। এভাবেই সমাজকে আমরা কিছু ফিরিয়ে দিতে পারি। কীভাবে এই বার্তা বিত্তশালী সমাজের কাছে আপনি পৌঁছবেন ?

আজিম প্রেমজি- আমার সবচেয়ে বড় আফশোস কী জানেন ? আমি অনেক দেরিতে শুরু করেছি। আজ থেকে ১৪-১৫ বছর আগে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের সরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষার মানোন্নয়নের ব্যবস্থা করে প্রথম সমাজসেবার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। গত চার বছরে অবশ্য অনেকটাই গতি পেয়েছে সেই উদ্যোগ। কিন্তু বড্ড দেরি করে ফেলেছি।

কিরণ মজুমদার শ- বিল গেটসের সঙ্গে যৌথভাবে কর্পোরেট দুনিয়াকে সচেতন করার যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটাও আপনার সমাজসেবামূলক কাজের আরেকটি দিক। আপনার কেন মনে হয় যে ভারতীয়রা আত্মকেন্দ্রিক এবং স্বার্থপর ?


image


আজিম প্রেমজি- (একটু ভেবে) এটা খুব গুরুতর আরোপ হয়ে গেল (দর্শকাসনে হাসির রোল)। আসলে আমার মনে হয় না যে মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে এটা দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন আছে। বেশিরভাগ মানুষই তাঁদের সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে অবগত। আমার মনে হয়, মূলত দুটি কারণে দেশের বিত্তশালী সমাজ দানধ্যান থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন আমেরিকা থেকে। প্রথমত, সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারার ক্ষেত্রে তাঁদের পরিবার অনেক বিস্তৃত হয়। দ্বিতীয়ত বেশিরভাগ উচ্চবিত্তই মনে করেন, তাঁদের সম্পত্তির ওপর একমাত্র অধিকার রয়েছে তাঁদের সন্তান সন্ততিদের। এটাই মূল প্রতিবন্ধকতা। ভারতের কিছু কিছু জায়গায় আবার এই চিন্তাধারা প্রকট। আমার মনে হয় দক্ষিণ ভারত এ ব্যাপারে অনেক বেশি উদার।

কিরণ মজুমদার শ- আজ এখানে বর্তমান আর ভবিষ্যতের উদ্যোগপতি ও বিত্তশালী জনতার প্রতিনিধিরা উপস্থিত। অর্থদানের মাধ্যমে সমাজসেবায় আপনি কীভাবে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করবেন ?

আজিম প্রেমজি- আমার মনে হয় বিত্তশালীদের নয়া প্রজন্ম অনেক বেশি উদার উত্তরসুরিদের চেয়ে। তাঁরা নয় সময়, নয় অর্থ, নয় শ্রম ব্যয় করেন সমাজসেবায়। আসলে আমার মনে হয়, এঁদের স্ত্রী বা ‘বেটার হাফ’ –কে উদ্বুদ্ধ করা আশু প্রয়োজন (দর্শকাসন উচ্ছ্বাসে ভরে গেল)। কারণ স্ত্রীরা সামাজিকভাবে অনেক বেশি দায়িত্বশীল।

কিরণ মজুমদার শ- আপনার কী মনে হয় যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সাহায্য করা প্রত্যেক প্রাক্তন পড়ুয়ার অবশ্য কর্তব্য ?

আজিম প্রেমজি- আমি আমার ‘আলমা মাতের’ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কিছুই ফিরিয়ে দিতে পারিনি (ফের হাসির রোল)। আমাদের ‘আলমা মাতের’-এর থেকে সাহায্যে র অনেক বেশি প্রয়োজন রয়েছে সমাজের। কিন্তু এটা বলতে চাই যে বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মূলত বিনিয়োগ করে অ্যালুমনাই-রাই।

কিরণ মজুমদার শ- কিন্তু আমি নিশ্চিত আপনার স্কুল বা কলেজ কর্তৃপক্ষ যদি সাহায্য চান, তবে আপনি তাঁদের ফিরিয়ে দেবেন না ?

আজিম প্রেমজি- তাঁরা সবসময়েই আমার কাছে আসেন (উচ্ছ্বসিত দর্শকাসনে হাসির রোল)

কিরণ মজুমদার শ- তাহলে আপনি কেন না করলেন ?

আজিম প্রেমজি- আমি শুধু আমার ফান্ড অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বন্টনে বিশ্বাসী (হাততালিতে ফেটে পড়লেন দর্শকরা)

কিরণ মজুমদার শ- আপনি যে সমর্থন কুড়োলেন আমি তার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না আজিম। কারণ আমার মনে হয় ‘আলমা মাতের’কে সাহায্য করা আমাদের দায়িত্ব। কারণ তাদের জন্যই আমরা আজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছি। (ফের সমর্থনসূচক ধ্বনি)

আজিম প্রেমজি- একথা বলে কিন্তু আপনি আমার থেকেও বেশি প্রশংসা কুড়োলেন কিন্তু (ফের হাসির রোল)


image


কিরণ মজুমদার শ- আমি আশাবাদী যে ওনারা (দর্শকরা) সত্যিই এটা বিশ্বাস করেন। আরেকটি প্রশ্ন আপনাকে করতে চাই, ‌যখনই সমাজসেবার প্রশ্ন ওঠে তখন সকলে বিল গেটস, এলন মাস্ক, ওয়ারেন বাফে কিংবা মার্ক জুকেরবার্গের কথা ভাবেন। কিন্তু ব্যাঙ্কার বা কর্পোরেট দুনিয়ার তাবড় তাবড় ব্যক্তিদের তো প্রশ্ন করা হয় না যাঁরা মোটা মাইনের বেতন পান ? তাঁদেরও কি চ্যারিটি করা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না ? এই সংস্কৃতিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন ?

আজিম প্রেমজি- আমি জানি না যে তাঁরা আদৌ চ্যারিটি করেন নাকি করেন না। এ ব্যাপারে কোনও মতামত প্রকাশ করতেও চাই না। হয়তো এই বিষয়টি কখনও প্রচারে আসেনি।

কিরণ মজুমদার শ- আমার মনে হয় সংবাদমাধ্যমের এই দিকটিকেও প্রচারের আলোয় নিয়ে আসা উচিত। সমাজসেবা নিয়ে সচেতনতা প্রসারে বিজনেস স্কুলগুলি কীভাবে সাহায্য করতে পারে ? আমাদের কী ফিলানথ্রোপি কোর্স শুরু করা উচিত ?

আজিম প্রেমজি- হা নিশ্চয়ই ! ... আর তাঁরা আপনাকে প্রফেসর হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন (ফের হাসিতে ফেটে পড়লেন দর্শকরা)। এইধরনের কোর্স অবশ্যই সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে।

(এরপরই কিরণ শ দর্শকদের সুযোগ দেন প্রেমজিকে প্রশ্ন করার। এবার তারই কিছু বিশেষ অংশ)

অর্থদান করতে গিয়ে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে, এই প্রশ্নের জবাবে প্রেমজি বলেন, “ সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সমস্যার গভীরতা, তার বিস্তার আর ব্যপ্তি । ভীষণ হতাশায় ভুগতাম। ‌যত বড়ই প্রতিষ্ঠান হোক না কেন তাকে সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষা করতেই হয়। এর থেকে মুক্তি নেই।”

দর্শকদের মধ্যে থেকেই উঠে এল আরেকটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন। কেন তিনি রাজনীতিতে যোগ দিলেন না ? উত্তরে প্রেমজি বললেন, “ তাহলে দু‍বছরের বেশি আয়ু হত না আমার। কারণ রাজনীতিতে আবেগের কোনও স্থান নেই। ”

এই কথোপকথনের সবথেকে চমকপ্রদ উত্তর তিনি দিলেন ‌যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হল, কখন একজন অর্থদান করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। প্রেমজি বললেন,

“ গত সপ্তাহে সংস্থার চ্যারিটির বিষয়টি প‌র্যলোচনার জন্য একটি বৈঠক চলছিল। একজন প্যানেলের সদস্য আমাকে জানালেন, ছোটবেলায় যখনই উপহার হিসেবে কোনও অর্থ তিনি হাতে পেতেন তার ২৫ শতাংশ দান করতেন। ২ বছর বয়স থেকেই এই অভ্যেস গড়ে উঠেছিল তাঁর। হয়তো এভাবেই সমাজসেবামূলক কাজের বীজ রোপিত হয় প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে। ”

লেখক দীপ্তি নায়ার

অনুবাদ শিল্পী চক্রবর্তী

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags