সংস্করণ
Bangla

জেলর বন্দিদের ডিজাইনার বানাচ্ছেন অভিষেক দত্ত

25th Aug 2017
Add to
Shares
30
Comments
Share This
Add to
Shares
30
Comments
Share
নাজিমুল শেখ, বছর বত্রিশের এই বন্দি সাত বছর জেল খাটছেন। আগে থেকেই রেডিমেড গার্মেন্টস তৈরি করতে জানতেন। অভিষেকের প্রশিক্ষণে ধীরে ধীরে মহিলাদের পোশাক তৈরিতে এক্সপার্ট হয়ে উঠছেন। আড়াই বছর পর জেল থেকে ছাড়া পেলে নিজে ব্যবসা শুরু করার পরিল্পনা ইতিমধ্যে ছকে ফেলেছেন। 

‘ভাবতেই ভালো লাগে, প্রশিক্ষণ শেষ হলে সংশোধনাগারের ৪১ জন বন্দি নিজেদের পরিচয় খুঁজে পাবেন, নিজেকে ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে প্রিতিষ্ঠিত করতে পারবেন’, তৃপ্ত শোনায় কলকাতার ফ্যাশন ডিজাইনারের সুর। তন্তুজ অথবা বিশ্ববাংলার আউলেটৈ বন্দিদের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রির জন্য চলে যাচ্ছে। জেলের বাইরে কোনওরকম আউলেট করা যায় কিনা তাও পরিকল্পনায় রয়েছে বলে জানান অভিষেক। ‘জেলবন্দিদের কাজে উৎসাহ দিতে মাঝে মাঝে সেলেবদের নিয়ে আসি। ওদের কাজ দেখে গিয়েছেন পরমব্রত,অলোকানন্দা, বিক্রম ঘোষ এবং জয়া শিল। ফ্যাশন শোর আয়োজন করেছি। আসলে জেলবন্দিদের কোনও কাজে উৎসাহিত করা বিরাট চ্যালেঞ্জের। কারণ জেলে থাকার জন্য কাজের দরকার পড়ে না। পোশাক ডিজাইনিং ওদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে। আর জেল থেকে বেরোনর পর নতুন করে জীবন এগিয়ে নেওয়ার শক্তি খুঁজে পাবেন’, আশাবাদী অভিষেক দত্ত।

আইআইটি এন্ট্রান্সের জন্য প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক সেই সময় মা নিয়ে এসেছিলেন Wigan & Leigh College এর ফর্মটা। ছেলের ক্যারিয়ার অন্য খাতে বইয়ে দিয়েছিল ওই একটা ফর্ম। মেধা তো বটেই সঙ্গে সৃজনশীলতা। এই দুইয়ের মিশেলে ফ্যাশনের গ্ল্যামার দুনিয়ায় নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছে অভিষেক দত্ত, বাংলা এবং ভারতীয় ফ্যাশন জগতে আরেক নক্ষত্র। ইওরস্টোরি বাংলার পাতায় আপনারা বেশ কিছু ফ্যাশন দুনিয়ার উদ্যোগপতিদের কাহিনি পড়ছেন গত কয়েক মাস ধরে। আমরা চাইছি সেই সব প্রতিভাধর ফ্যাশন ডিজাইনারদের চেনাতে যারা এই শহর থেকে মাথা তুলে গোটা আকাশটা জয় করার স্বপ্ন দেখছেন। সেই সিরিজেই আজ পড়ুন অভিষেকের কাহিনি।

image


ফ্যাশন স্কুলে পড়ার সময় থেকেই সৃজনশীলতার ধার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন অভিষেক। জিতে নিয়েছিলেন গ্র্যাজুয়েশন শো Entr'acte99 এবং স্মিরনফ ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাশন অ্যাওয়ার্ড। প্রতিযোগিতার দৌড়ে নিজেকে এগিয়ে রাখতে ডেনিম, ভেলভেট, লেদারকে প্রতিদিনের ব্যবহারিক পোশাকের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে থাকেন। সঙ্গে অ্যাম্ব্রয়েডারি এবং চিত্র শিল্প। শুধু পুরুষ বা শুধু মহিলা নয়, অভিষেক পুরুষ, মহিলা সবার জন্য ডিজাইন করেন। ওয়েস্টার্নের সঙ্গে দেশি সবরকম পোশাক পাওয়া যাবে তরুণ ডিজাইনারের কালেকশনে। হ্যান্ডলুম এবং ভেষজ ফ্রেব্রিকসের সঙ্গে নিজস্ব ডিজাইনের কাট নিয়ে নানা রকম এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালোবাসেন অভিষেক। ভারতীয় নির্যাস ধরে রেখে পাশ্চাত্য ডিজাইনের ফিউশন জনপ্রিয় করে তুলেছে অভিষেকের ব্র্যান্ডকে। শুধু পোশাক ডিজাইনেই আটকে রাখেননি নিজেকে। পুরুষদের অ্যাক্সেসরিজ থেকে ফুটওয়্যার, বাড়িয়েই চলছেন ডিজাইনের পরিসর।

২০০২ সালে নিজের ব্র্যান্ড Abhishek Dutta আনুষ্ঠানিকভাবে লঞ্চ করেন। গত ১৫ বছর ধরে প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন আর সমৃদ্ধ করেছেন ভারতের ফ্যাশন দুনিয়াকে। রুপোলি পর্দার সেলেব বিদ্যা বালান থেকে কঙ্কনা সেনশর্মা, রাইমা সেন অভিষেকের ডিজাইনে কখনও ব়্যাম্প কখনও রেড কার্পেট কখনও বা পর্দা কাঁপিয়েছেন।

গতে বাঁধা ভাবনা নয়, ফ্যাশন নিয়ে অভিষেকের এক্সপেরিমেন্ট বরাবরই হটকে। আর সেটাই নজর কেড়েছিল ফ্যাশন বোদ্ধাদের। ২০০১ সালেই মিস ইন্ডিয়ার আউটফিট ডিজাইনের দায়িত্ব পান। ২০০৫ এ আন্তর্জাতিক বাজারে পা রাখা। বালি ফ্যাশন উইকে একমাত্র ভারতীয় ফ্যাশন ডিজাইনার হিসেবে পোশাক শোকেজ করার আমন্ত্রণ পান। ২০০৬ এবং ২০০৭ এ এশিয়ান ফ্যাশন উইকে র্যাম্প মাতান। শোধু পুরুষ বা মহিলার পোশাকে নিজেকে বেঁধে রাখেননি। ইন্টিরিয়র ডেকোরেশনেও পা রেখেছেন অভিষেক। পেট্রিকো—নিউইয়র্কের সঙ্গে জুড়ে বেডশিট, কুশন কভার ডিজাইনও শুরু করে দেন। দেশ জুড়ে ২০টির বেশি ডিজাইনার স্টোরে অভিষেকের কালেকশন পাওয়া যায়। কলকাতার গরচা রোডে ১,১৫০ স্কোয়ার ফুটের শোরুম নিজেই সাজিয়েছেন। ডিজাইনিং পোশাকের পাশাপাশি বাচ্চাদের পোশাক আর ল্যাপটপ ব্যাগের মতো লেদার এক্সেসরিজও রাখা হয়েছে এখানে। ডিজাইনের পাশাপাশি ব্যবসাটাকেও রপ্ত করেছেন ভালোই। সাক্ষী কস্টিউম জুয়েলারির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে নিজের ডিজাইনিং পোশাক বাজারে ছেড়েছেন। মুম্বই, হায়দরাবাদ, শিলিগুড়ি, ভূবনেশ্বরে ফ্ল্যাগশিপ স্টোর থেকে উত্তরের রাজ্যগুলিতেও পৌঁছে গিয়েছেন বাঙালি ডিজাইনার।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে কাজটি তিনি করেছেন তা হল, আলিপুরে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের ৪১ জন সাজাপ্রাপ্তকে পোশাক তৈরির প্রশিক্ষণ। বন্দিদের বেশিরভাগই যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। তাদের উপার্জনক্ষম করাই লক্ষ্য। কীভাবে জড়ালেন এই কাজে? সেই সময় স্বল্প আয়ের তাঁতীদের উন্নয়নে রাজ্য সরকারের একটি প্রকল্পের সঙ্গে ছিলেন অভিষেক। এই খবর কানে যায় ডিরেক্টর জেনারেল প্রিজন অরুণকুমার গুপ্তার। ‘তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রস্তাব পেয়ে দেরী করিনি। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাই ’, জানান তরুণ ডিজাইনার। গোড়ার দিকে একটা হলে ওয়ার্কশপ হত। পরে জেলের মধ্যে একটি নতুন ভবনে কর্মশালাটি সরিয়ে নেওয়া হয়। জেলবন্দিরা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ৪টে পর্যন্ত কাজ করেন। এক একটা ইউনিটে ২৪টি করে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে। ‘বন্দিরা যাদের এই কাজের জন্য বাছা হয়েছে প্রত্যেকেই আমার নজরে রয়েছে। ট্রেনিং সম্পূর্ণ হলে তাদের হাতে তৈরি পোশাক বাজারজাত করতে পারবেন তাঁরা। কেউ কেউ তো খুব দ্রুত শিখেছেন’, বলে চলেন দত্ত, যিনি হ্যান্ডলুমকে আবার বাংলায় ফিরিয়ে শান্তিপুর ও ফুলিয়ার আড়াইশো তাঁতীকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার রসদ যুগিয়েছেন। ‘বন্দিদের মধ্যে ১৭ জন আগে থেকে সেলাই ফোঁড়াই জানতেন। আমি তাঁদের সেলাই এবং কাটিং বিশেষভাবে শিখিয়েছি যাতে আমার ব্র্যান্ডের জন্য জামা কাপড় তৈরি করতে পারেন। প্রথম দিকে নেহরু জ্যাকেট, পালাজো, কুর্তা,ধুতি প্যান্ট এইসব সোজা কাটের পোশাক বানাতে শেখাচ্ছি’,গল্প করছিলেন অভিষেক। আপাতত পুরুষ বন্দিদের নিয়ে কর্মশালা হলেও পরবর্তীতে মহিলা বন্দিদের নিয়েও পরিকল্পনা রয়েছে অভিষেকের।

পোশাক ডিজাইন করে খুব বেশি পাওনা হয় না জেলবন্দিদের। কিন্তু বন্দি জীবন কাটাতে ওইটুকুন যথেষ্ট। এক একটা জ্যাকেট ৩০০০ থেকে ৫০০০ টাকায় বিক্রি হয়। যেখানে ডিজাইনারের জ্যাকেট ১০,০০০ এর কম নয়। অভিষেক দত্ত—তন্তুজ এই লেবেলে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে জেলে তৈরি পোশাক। ‘জেলের বাইরে ফোন রেখে যেতে হত। প্রথম প্রথম এই ব্যবস্থা মানিয়ে নিতে অসুবিধা হত। পরে নতুন বিল্ডিংয়ে চলে যাওয়ার পর সেই সমস্যা কেটে যায়। যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হল প্রত্যেকেই পুরুষ। আমার মহিলা সহকর্মীরা তাঁদের প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে কখনও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হননি’, অভিজ্ঞাতার কথা বলে চলেন অভিষেক।

এমন ধরনের কাজ করতে গিয়ে নিজেও উৎসাহ পেয়েছেন। যেখানে প্রতিযোগিতা নেই, মার্কিটিংয়ের টেনশন নেই, গ্ল্যামারের ঘনঘটা নেই। একেবারে অন্য ধরনের চ্যালেঞ্জ। জেলবন্দিদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা, পোশাকের ভাঁজে ভাঁজে জীবনের গান বেঁধে দেওয়া। এককথায় সেই অভিজ্ঞতা ‘অসাধারণ’, বলেন বাঙালি তরুণ ডিজাইনার অভিষেক দত্ত। এখানে থেমে থাকতে চান না। রাজ্যের অন্য জেলগুলিতেও পা রাখতে চান অভিষেক। এবার লক্ষ্য দমদম জেল। তন্তুজকে সঙ্গে নিয়ে দমদম জেলেও একইভাবে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করে ফেলেছেন দত্ত।

Add to
Shares
30
Comments
Share This
Add to
Shares
30
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags