সংস্করণ
Bangla

৩২ বছর ধরে আর্তের পাশে মুর্শিদাবাদের সূর্যসেনা

28th Apr 2016
Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share

“সূর্যসেনা এই নামকরণের পেছনে দুটো কারণ আছে। প্রথমত সূর্যের সেনা আমরা। দ্বিতীয়ত, বহরমপুর কলেজের ছাত্র ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের নায়ক বিপ্লবী সূর্য সেন। তাই মাষ্টারদার নামে আমাদের সংস্থার নাম রাখা হয়েছে সূর্যসেনা।” বলছিলেন নির্মল সরকার। মুর্শিদাবাদে খুব জনপ্রিয় একটি নাম। এর একটা সঙ্গত কারন তিনি একটা সময় রাজনীতি করতেন। যুক্ত ছিলেন আর.এস.পি-র সঙ্গে। কিন্তু সেটাও অতীত। নির্মলবাবুর জীবনদর্শনের সঙ্গে রাজনীতির অন্ধকার দিকগুলো মিলছিল না। ফলে পার্টি ছেড়েছেন। তবু মুর্শিদাবাদে নির্মলবাবুর জনপ্রিয়তায় একটুও ভাটা পড়েনি। বরং বেড়েছে একটু একটু করে। কারন এই সূর্যসেনা। নির্মল সরকারের তৈরি করা এই সংস্থা।

image


১৯৮৪ সাল থেকে এই সংস্থা চালাচ্ছেন নির্মলবাবু। এই সংস্থা বিদেশ থেকে আসা আর্থিক অনুদান নিয়ে রাস্তার শিশুদের চকলেট বিলোয় না। নিজেদের পকেট উল্টে নির্মল বাবু ও তার সঙ্গীরা এই সংস্থা চালান। দরিদ্র দুঃস্থ পরিবারে লুকিয়ে থাকা প্রতিভার উন্মেষ ঘটানোর চেষ্টা করেন। নির্মলবাবু বলছেন আমরা সারা বছর ধরে ওয়ার্কশপ করি। পুরো মুর্শিদাবাদ জুড়ে। জেলার বাইরেও ওয়ার্কশপ চালু হয়েছে অনেকদিন। ওয়ার্কশপ আয়োজন করার উদ্দেশ্য থাকে সেই অঞ্চলের গরিব, আর্থিকভাবে অসহায় মানুষদের ডেকে তাদের নানা রকমের পরামর্শ দেওয়া যে কষ্টের মধ্যেও কীভাবে এরা সতভাবে বেঁচে থাকতে পারেন। একইসঙ্গে তাদের পরিবারের সন্তান সন্ততিদের মধ্যে কেউ যদি কারিগরি বিদ্যায় সম্ভবনাময় হয়ে থাকে, তাকে আমরা চেষ্টা করি বিশেষভাবে উৎসাহ দিতে। বিশেষভাবে উৎসাহ বলতে, যৎসামান্য হলেও সূর্যসেনা সেই প্রতিশ্রুতিবান গরীব ছেলেটিকে আর্থিকভাবে সাহায্য করে। নির্মলবাবু উদাহরণ দিয়ে জানালেন কোন ছেলে হয়তো ভাল গান করে, অথবা কোন গরীব পরিবারের মেয়ে হয়তো ভাল আবৃতি করে। ওয়ার্কশপ চলাকালিন এই ধরনের সম্ভবনাময় প্রতিভা দেখলে তাকে বিশেষভাবে উৎসাহ দেয় সূর্যসেনা।

মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার অভ্যেস নির্মলবাবুর সেই ছোটবেলা থেকে । আর ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ছিলেন নির্মল বাবুর অভ্যেসের প্রেরণা। বলছিলেন, “নবম শ্রেণীতে পরার সময় থেকেই অন্য মানুষের জন্য ঝাপিয়ে পরাই ছিল আমার এবং আমার বন্ধুদের অভ্যেস। কারণ তখনই আমরা বিপ্লবীদের জীবনকাহিনি পড়েছি। আর স্বপ্ন দেখছি ওদের মতো আমরাও যদি কিছু করে সমাজের নায়ক হতে পারি।”

নির্মল বাবুর জন্ম মুর্শিদাবাদেই। হরিদেবপুর সাবডিভিশনে ষড়াপুর গ্রামে। সেখানকার স্কুলেই পড়াশুনা। আর স্কুলে পড়তে গিয়ে তিনি জেনেছিলেন তাঁদের স্কুলেও ছিল বিপ্লবীদের যাতায়াত। জেনেছিলেন নলিনী বাগচীর মতো বিপ্লবীদের কথা। তারপর বহরমপুর কলেজে গিয়ে জানলেন মাস্টারদা ওই কলেজের ছাত্র ছিলেন। নির্মল বাবুর জীবন দর্শনের ভিত অল্প বয়সে ওঁরাই গড়ে দিয়েছেন। সেই কারণে ৭২ বছর বয়সে পৌঁছেও নির্মল বাবুর নিরলস পরিশ্রম দেখে অবাক হয়ে যান তাঁর সঙ্গীরা। সূর্যসেনা সংস্থার নিজেস্ব একটি পত্রিকা আগে থেকেই ছিল। নির্মল বাবুরা তারপর বহরমপুরে তৈরি করেছেন সূর্যসেনা ভবন। এই ভবনেই এখন সূর্যসেনার ওয়ার্কশপ হয়। একসময় ডাকসাইট নেতা ছিলেন বহরমপুরে। কিন্তু রাজনীতির সঙ্গে সংস্রব ত্যাগ করেছেন অনেক বছর। নির্মল বাবু বলেছেন, “রাজনীতির অন্ধকার ছবিটা বহুদিন আগেই দেখে নিয়েছি। তাই সেখান থেকে বেরিয়ে আসতেও দ্বিধা হয়নি। যেখানে আদর্শ বা নীতির কোন স্থান নেই সেখানে কাজ করা অসম্ভব।” কিন্তু তাঁর রক্তে ঢুকে গিয়েছে আদর্শের বীজ। সেই কারণে নির্মল বাবু বলেন “একজন সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে আমি মনে করি সমাজের প্রতি একটা কর্তব্য আছে। সেই বোধ থেকেই সূর্যসেনা তৈরি করেছি।”

সূর্যসেনা চালাতে বছরে খরচ হয় মাত্র হাজার পঁয়ত্রিশ টাকার। কোনও স্পনসর নেই। নির্মল বাবুরা নিজেরাই জোগাড় করেন এই টাকা। সূর্যসেনার এখন সদস্য ২৬ জন। এবার নির্মল বাবুদের লক্ষ্য গরীব মানুষের জন্য একটা মেডিসিন ব্যাঙ্ক তৈরি করা। সেই কাজ শুরু করে দিয়েছে সূর্যসেনা।

Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags