সংস্করণ
Bangla

রুস্তম সেনগুপ্ত গ্রামীণ ভারতের "শক্তিমান"

tiasa biswas
25th Aug 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

অন্ধকারে ডুবে থাকা ভারতের অধিকাংশ গ্রাম এখন শক্তিমানকে খুঁজছে। যে বিদ্যুৎ নিয়ে আসতে পারে। আর সেই শক্তিমান এক সাহসী বঙ্গতনয়। রুস্তম সেনগুপ্ত। তাঁর সংস্থা বুঁদ রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন রুস্তম।

image


রুস্তম সেনগুপ্ত। আর দশটা উচ্চাকাঙ্খী ‌বাঙালি যুবকের মত পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বড় চাকরি পেয়ে চলে গিয়েছিলেন সিঙ্গাপুর। বহুজাতিক সংস্থার ফিন্যান্স ম্যানেজারের পদ। মাস গেলেই ছয় অংকের মোটা মাইনে। কিন্তু গতানুগতিক জীবন সইল না রুস্তমের। ছেড়ে দিলেন চাকরি। শুরু করলেন নিজের ব্যবসা। রুস্তমের ছোট্ট সংস্থা ‘বুন্দ’ মানে বিন্দু। ভারতের গ্রামে গ্রামে শক্তি (এনার্জি প্রসেস) নিয়ে পৌঁছে যায় ‘বিন্দু’। ‘ভারতের জনসংখ্যার একটা ছোট্ট অংশ ভালো একটা চাকরি পেয়েই সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু গ্রামে ‌যে একটা বিরাট অংশ থাকে তারা নুন্যতম রোজগারটুকুও করে না। রিভলিভং চেয়ারে বসে বসে অবস্থাপন্নদের আরও ধনী বানানোর চাইতে আমি এমন কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম ‌যেটা সবার মনে ছাপ ফেলবে, আমার ভালো লাগবে’, বলছিলেন ‘বুন্দ’এর তরুন প্রতিষ্ঠাতা রুস্তম সেনগুপ্ত।

রুস্তম ওসনগুপ্ত(ডানদিকে), প্রতিষ্ঠা ও সিইও,  বুন্দ

রুস্তম ওসনগুপ্ত(ডানদিকে), প্রতিষ্ঠা ও সিইও, বুন্দ


ভারতের গ্রাম বাংলায় শক্তি সরবরাহ করতেই ‘বুন্দ’এর জন্ম দিয়েছিলেন তরুণ উদ্যোগপতি রুস্তম।‘বুন্দ’ সৌর বাতি, জল পরিশোধন ফিল্টার, মশারি এইসব তৈরি করে প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেয়। শুধু পণ্য তৈরিই নয়,সেগুলি যাতে কম দামে অথচ টেকসই হয় সেদিকেও সতর্ক নজর রেখেছিলেন রুস্তম। ‘বুন্দ’ নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারের শুরুতে রুস্তম চেয়েছিলেন নিজে প্রত্যন্ত এলাকাগুলির জায়গায় জায়গায় গিয়ে জিনিসপত্র পৌঁছে দেবেন। তার জন্য কখনও কখনও ঝাড়খণ্ড এমনকী বাংলার বিপদ সংকুল মাওবাদী এলাকাতেও দিন নেই রাত নেই ঘুরেছেন। নিজের মত করে উন্নয়নের বার্তা নিয়ে বাংলার মাঠে ঘাটে ঘুরেছেন অনেক।

image


এবং বুঝেছেন শুধু ব্যবসায়ীক দিক নয়। অর্থাৎ বিনিয়োগ, পণ্য তৈরি এবং সেটা জায়গা মতো পৌঁছে দিলেই কাজ শেষ হয় না। চাই গ্রাম বাংলার মানসিকতার পরিবর্তন। রুস্তমের কাছে, সবচেয়ে বড় কথা, একটা লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে মানুষকে সংঘবদ্ধ করতে হবে। ‘আমরা মানুষের মধ্য সেই বিশ্বাসটা আনতে চেয়েছিলাম, যাতে প্রত্যেকে ভাবতে পারে যার যতটাই অবদান থাক এই পরিবর্তনে সবাই একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ’, বলেন রুস্তম।

২০০৯ এ ‘বুন্দ’এর জন্ম। তখন থেকে আজ পর্যন্ত ৬ হাজার সৌর প্যানেলের মাধ্যমে ৫০ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছেন। রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশে তিন স্তরের জনগোষ্ঠীর চাহিদা মটাতে সক্ষম হয়েছে। গ্রামীণ নিম্নবিত্ত,‌যাদের আয় দিনে ২৫০-৬০০ টাকা তাদের ‌যেমন কাজে লেগেছে।তেমনি ছোট ছোট ব্যাবসায়ী বা উদ্যোক্তা ‌যাদের তুলনায় একটু ভালো উৎপাদনের জন্য শক্তির প্রয়োজন। শেষটি হল একদম প্রান্তিক অবস্থায় যারা দাঁড়িয়ে। এদের কারও দৈনিক আয় দিনে শ‍ খানেক টাকা, কখনও একেবারেই শূন্য। ‘বুন্দ’ এদের সবার বাড়িতে ১০ ওয়াটের সোলার হোম সিস্টেম পৌঁছে দিয়েছে যাতে ঘরে দুটি করে বাল্ব জ্বলতে পারে, মোবাইল চার্জ করা যেতে পারে মাসে মাত্র শ খানেক টাকা খরচ করে।

image


‘বুন্দ’ এর সৌরবাতি, জলের ফিল্টার এবং মশারি প্রত্যন্ত গ্রামের গবির মানুষের কাছে পৌঁছে ‌যাচ্ছে।দাম তাদের সাধ্যের মধ্যে, উন্নত মানের এবং গ্রাহক পরিষেবাও নিয়মিত।‘বুন্দ’ এর লক্ষ্য ভারতের পাঁচ থেকে ছটি রাজ্যের ১০০টি জেলায় মানুষকে আলো, পরিশ্রুত জল এবং কীটপতঙ্গ থেকে সুরক্ষার সমাধান নিয়ে অন্তত ১০ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া। এর মাধ্যমে রুস্তম শুধু গ্রামের প্রান্তিক মানুষগুলির জীবনধারনের মান উন্নয়নই নয়, পাশাপাশি নিজের ‘বুন্দ’ কেও একটা লাভজনকসংস্থার দিকে এগিয়ে নিচ্ছেন।‘চোখের সামনে সবকিছু বদলে যেতে দেখছি। তার চাইতে বড়কথা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।তাদের সুখ,দুখে জড়িয়ে পড়ছি।দেখতে পাচ্ছি কীভাবে অল্প সময়ে তাদের জীবনমানের উন্নতি ঘটছে।তাদের হাসি মুখ দেখে তৃপ্তি পাচ্ছি।ব্যাঙ্কে কাজ করে বা পরামর্শ দিয়ে সেই আনন্দ কোথায়? আমাদের পরিষেবা এবং পণ্যগুলি এমনভাবে তৈরি যেটা মানুষের লাগবেই।সেই প্রয়োজনীয়তাকে মাথায় রেখে পরিকল্পনাকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি’, বলেন তৃপ্ত রুস্তম।‘যাদের অনেক আছে,তাদের আরও পাইয়ে দেওয়ার চাইতে আমি এমন একটা কিছু করতে চেয়েছিলাম যা গরিব মানুষগুলোর মুখের হাসি ফোটাবে, আমার ভালো লাগবে’, বলে চলেন রুস্তম। ‌তাঁর মতে, আসল চ্যালেঞ্জ একটা দৃষ্টান্ত তৈরি করা। যেটা শুধু দেখনদারি নয়, সত্যি সত্যি একটা স্থায়ী প্রভাব ফেলবে মানুষের জীবন ধারণে। ‘একটা কথা আছে, ছোট ছোট বিন্দু সাগর তৈরি করে।আমরা এই দর্শন মেনে চলি। ছোট ছোট উদ্যোগগুলিই অনেকটা পথ যেতে পারে, একদিন বড় উদ্যোগে সামিল হতে পারে। অর্থাৎ বিন্দু থেকে সিন্ধু’, বোঝান রুস্তম।‘বুন্দ’ ‌যেখানে যেখানে ব্যবসার বিস্তার করছে সেখানকার সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজেও সামিল হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন চিংড়ি প্রকল্পে খুব কম সুদে(৬ মাসে ৬ শতাংশ)বিনিয়োগ করেছে।দারিদ্র সীমার নীচে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করেছে রুস্তমের সংস্থা। মনিপুরে লিটানে আদিবাসী স্কুলে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বুন্দ কমিশন।শুধু তাই নয়, প্রয়োজন মতো শিক্ষা ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করে থাকে। ‘আমি জানি বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। এই চ্যালেঞ্জ থেকেই এগিয়ে চলার সাহস পাই। কারণ আমি মনে করি ‘বিন্দু’তে দেওয়া আমার প্রতি মূহুর্তের সঙ্গে সামাজিক দায়বদ্ধতা জড়িয়ে রয়েছে। একজন সামাজিক উদ্যোক্তার জিত যেমন আছে,হারও আছে। খুব খারাপ দিন যেমন আসতে পারে, ভালো দিনের হাতছানিও থাকে’, এই ভেবেই এগিয়ে চলেন ‘ছুপা’ রুস্তম সেনগুপ্ত।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags