সংস্করণ
Bangla

মাসিক নিয়ে পুরনো ধারণায় দাঁড়ি টানলেন অদিতি

মাসিক নিয়ে ভারতীয় নারীর সংকোচ ভাঙার আন্দোলন করছেন অদিতি ।

14th Aug 2015
Add to
Shares
24
Comments
Share This
Add to
Shares
24
Comments
Share
অদিতি গুপ্তা

অদিতি গুপ্তা


মাসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বাজারে সুলভ পণ্যগুলির মধ্যে হুইশপার-ই সবথেকে বেশি জনপ্রিয়। বয়ঃসন্ধির সময় থেকেই আমি ভাবতাম, মাসিকের সঙ্গে এই নামটি ঠিক কিভাবে যায়। আদতে মাসিক এমনই একটি বিষয় যা সাধারণত ফিসফিস করেই বলা হয়, যাতে কেউ এসম্পর্কে জানতে না পারে। আচার ধরবে না। মাসিকের সময়কার মা-মাসিমাদের এই নির্দেশ এখন বদলে গিয়ে হয়েছে, মেয়েটি আচার ধরে ফেলেছে। হুইসপারের বিজ্ঞাপেনর এই জিঙ্গল আমি কখনসখনও গুনগুন করতাম। ভাবতে অবাক লাগছে, একসময়কার অচ্ছুত হয়ে থাকা মাসিকের মত বিষয়ে মূলস্রোতের গণমাধ্যমেও এখন আমরা কতটা সহজে কথা বলতে পারি। কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে এখনও লাখো মহিলা এধরনের আধুনিক পণ্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাঁদের কাপড় কিংবা অস্থায়ী অন্যকিছু দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে হয়। কিন্তু অদিতি গুপ্তার মত জনা কয়েক মানুষের প্রচেষ্টা তাঁদের এক নয়া ভবিষ্যেতরই খোঁজ দিচ্ছে।

মেনস্ট্রুপিডিয়া ওয়েবসাইটের স্রষ্টা অদিতি গুপ্তা, তাঁর সাইটের মাধ্যমে মাসিক স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সমাজকে শিক্ষিত করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অদিতির এই চেষ্টা প্রশংসনীয়। তবে তাঁর চলার পথটা আরও বেশি অনুপ্রেরণা দেয়। ঝাড়খণ্ডের ছোট শহর গারওয়া থেকে উঠে আসা মেয়ে অদিতি। বেড়ে উঠেছেন রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত পরিবারে। ছোট বয়স থেকেই মাসিক নিয়ে নানা ছুতমার্গের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ঘটেছিল। বারো বছর বয়সেই ঋতুচক্রের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে। অদিতির কথায় “আমি মা-কে জানিয়েছিলাম। জানতে পেরে মা আমায় আড়াই মগ জল দিয়ে স্নান করিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এমনটা করলে মাসিক মাত্র আড়াই দিন-ই স্থায়ী হবে। যাই হোক, এমনটা হয়নি। বরং মাসিকের সঙ্গে আরও যন্ত্রণা-বিপত্তি বয়ে এনেছিল।” ওই সময় অদিতির অন্য কারও বিছানায় বসার অনুমতি ছিল না। পুজোর জায়গা কিংবা বাড়ির যাকিছু পবিত্র, এমন কোনওকিছুই ছোঁয়ার অনুমতি ছিল না অদিতির। তাঁকে আলাদা করে জামাকাপড় ধুঁতে ও শুকোতে হত। ওইসময় তাঁর আচার খাওয়া কিংবা ছোঁয়ার অনুমতি ছিল না। মনে করা হত, আচার ছুলে তা নষ্ট হয়ে যাবে। “মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমাকে বিছানার চাদর ধুতে হত। সে বিছানায় দাগ পরুক চাই না পরুক। ওগুলোকে অশুদ্ধ ও দূষিত বলে মনে করা হত। সাতদিন পর আমি যখন স্নান করে চুল ধুতাম, তখনই আমায় বিশুদ্ধ মনে করা হত।” অদিতির এই অভিজ্ঞতা কোনও ব্যতিক্রম নয়। এখনও দেশের বহু মহিলাকে প্রতিমাসে এমনটা সহ্য করতে হয়। শিক্ষিত ও অর্থ থাকায়, অদিতির বাবা-মা অনায়াসেই মাসিকের দিনগুলিতে তাঁকে স্যাইনটারি প্যাড কিনে দিতে পারতেন। কিন্তু, সমস্যাটা অন্য। “স্যানিটারি প্যাড কিনতে কে বাজারে যাবে? ঝুঁকিটা সেখানেই। সেইসঙ্গে পরিবারের সম্মানের প্রশ্নও জড়িত।” ফলত বাধ্য হয়েই অদিতিকে কাপড় ব্যাবহার করতে হত। যেটা কাচার পর স্নানঘরের কোনায় অপরিচ্ছন্ন-স্যাঁতস্যাতে জায়গায় শুকোতে হত। সবচাইতে বড় বিষয়, বাড়ির কোনও পুরুষ সদস্য যাতে এবিষয়ে জানতে না পারে, সেজন্য সদাসতর্ক থাকতে হত।


image


“এমনকি আজও বারো বছর বয়সের সেই দিনগুলির জন্য আমার কষ্ট হয়।” অদিতি বলছেন, “সেই ঊনিশশো বিরানব্বই থেকে আজও মাসিক একটি অনুচ্চারিত অভিশাপ হয়ে রয়েছে।”

স্কুলের দিনগুলিতেও সেই একই ধারা প্রবহমান। এমনকি স্কুল কর্তৃপক্ষের তরফে পড়ুয়াদের শিক্ষিত করার নিরন্তর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও। যেমন নবম শ্রেণির আগে মাসিক সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। যদিও, এই বয়সের অনেক আগেই মেয়েদের মাসিকের অভিজ্ঞতা হয়ে যায়। এমনকি, উদার মনের শারীরবিদ্যার পুরুষ শিক্ষকও অদ্ভুতভাবে মাসিক কিংবা শিশুজন্মের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতেন। “আমরা বড় হওয়ার সময় থেকেই আমাদের শরীর-আমাদের নিজস্ব অধিকারকে অস্বীকার করতে শিখে গেলাম। সেইসঙ্গে পারিপার্শ্বিক সমস্তকিছুই। তা শিশুর যৌনহেনস্থা হোক, মাসিক, গর্ভাবস্থা হোক কিংবা সঙ্গম। এমনকি কাউকে স্পর্শ করা কিংবা জড়িয়ে ধরার মত বিষয়গুলি এখনও সমাজে লজ্জাজনক ও হতবুদ্ধিকর বলেই গণ্য হয়।” কিন্তু অন্য একটি শহরে একটি বোর্ডিং স্কুলে পড়ার সময় অদিতি কাপড়কে চিরবিদায় জানাতে পারে। কেননা, তাঁরই এক বন্ধুর কাছ থেকে সে জানতে পারে, শহরের যেকোনও ওষুধের দোকান থেকে সে আধুনিক ন্যাপকিন কিনতে পারে। “তাই, আমি একটি ওষুধের দোকানে যাই ও অত্যন্ত লজ্জার সঙ্গে একটি ব্র্যান্ডের ন্যাপকিন চাই। দোকানদার ন্যাপকিনের প্যাকেটটি প্রথমে পেপারে মুড়ে ও এরপর একটি কালো পলিব্যাগে মুড়ে আমার দেন। পনের বছর বয়সে আমি প্রথমবার স্যাইনটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করি।” স্নাতকোত্তর পড়ার সময় অদিতির পরিচয় হয় তুহিন নামে এক যুবেকর সঙ্গে। পরে তাঁকেই বিয়ে করেন অদিতি। অদিতির মেনস্ট্রুইপেডিয়া নিয়ে কাজকর্মের অন্যতম সমর্থক তুহিন। তাঁরা একসঙ্গে বেশকিছু প্রজেক্টেও কাজ করতে থাকেন। তুহিনের ছোটো ভাই ছিল, তাই স্কুলের পড়াশোনার বাইরে মাসিক সম্পর্কে তাঁর বিশেষ কিছুই জানা ছিল না। কিন্তু, প্রতিমাসে অদিতির মধ্যে সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করার পর, মাসিক সম্পর্কে তুহিনের আগ্রহ বেড়ে যায়। এরপরই মাসিক সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন তুহিন। যাতে মাসের ওইদিনগুলিতে অদিতিকে সে কিছু সাহায্য করতে পারে।


image


“তুহিন আমায় মাসিক সম্পর্কে অনেককিছু বলেছিল, যা আমিও জানতাম না।” শুধু তাই নয় অদিতি বলছেন এই বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। যা তাঁকে মাসিক সম্পর্কে লাখো মহিলার কাছে সঠিক বক্তব্য পৌঁছে দিতে অনুপ্রাণিত করে। “এরপরই আমি মাসিক নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে এক বছেরর একটি প্রকল্প নিই। এই গবেষণাই মেনস্ট্রুইপেডিয়া গঠনের ভিত তৈরি করে দিয়েছিল।”

অদিতি তাঁর প্রচেষ্টার অভূতপূর্ব সাড়া পান। মাসিক নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তাদের বক্তব্য মেয়েদের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। এমনকি বাবা-মা ও শিক্ষাবিদদেরও কাছে অদিতির উদ্যোগ স্বীকৃতি পেতে থাকে। অদিতির তৈরি করা ওয়েবসাইটটির প্রতিমাসে অন্তত এক লক্ষ পাঠক আছেন। শুধু তাই নয়, গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশ পাওয়া মেনস্ট্রুইপেডিয়ার হাস্যকৌতুক পত্রিকা দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ সহ ফিলিপিন্সেও রীতিমত জনপ্রিয়। এতটাই ভালো সাড়া ফেলেছে যে এই পত্রিকাটি আটটি ভিন্নভিন্ন ভারতীয় ভাষা ও তিনটি বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করার জন্যে প্রচুর স্বেচ্ছাসেবকও এগিয়ে এসেছেন। খুব শিগ্‌গিরই বাজারে আসতে চলেছে মেনস্ট্রুইপেডিয়ার মাল্টিমিডিয়া অ্যাপও। 


image


বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছনোর পর থেকেই অদিতির জীবনটা বদলে যেতে থাকে। অদিতির কথায়, “এখন আমরা বহু মানুষকে এবিষয়ে কথা বলতে শুনি। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষজন এখন এই বিষয়ে প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন। বাবা-দাদুরা এখন মেয়েকে শিক্ষিত করতে মেনস্ট্রুইপেডিয়ার হাস্যকৌতুক পত্রিকা বাড়ি কিনে নিয়ে যান।” যখন একটি মেয়েকে মাসিকের বিষয়টি তার বাবা ও ভাইয়ের থেকে লুকিয়ে যেতে বলা হয়, বাড়ির সেই পরিচিত বৃত্ত থেকেই মাসিক নিয়ে গোপনীয়তা শুরু হয়। বাড়ির ছেলেটিকে এসম্পর্কে কিছুই জানানো হয় না। ফলত, তার এই বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানা হয়ে ওঠে না। যদিও, শুধু মেয়েদেরই নয়, একজন ভাই, একজন বাবা ও স্বামীরও এবিষয়টি নিয়ে সচেতন থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

“মেনস্ট্রুইপেডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করার পর থেকে নানাভাবে আমাদের আত্মবিশ্বাস বিভিন্ন ভাবে বেড়েছে।”‌ পাশাপাশি অদিতি বলছেন, এটা সেই মানুষগুলির এককাট্টা উদ্যোগ, যাঁরা মেনস্ট্রুইপেডিয়াকে তাঁদের নিজের করে ফেলেছেন। যাঁরা সংস্কারের ছুতমার্গ ভাঙার দায়িত্ব সংঘবদ্ধ ভাবে নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। “সংস্থার তহবিল গঠনের সময় যেভাবে মানুষ সাড়া দিয়েছেন, তা আমাদের এই উদ্যোগের ওপর আস্থা-আমাদের আত্ববিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছিল। প্রতিটি গল্প, প্রতিটি কবিতা- প্রতিটি কণ্ঠস্বর—যা মাসিক নিয়ে সাবেকি চিন্তাধারার বিরুদ্ধে কথা বলে—সেই সমস্তই আমায় অনুপ্রেরণা জোগায়।”

Add to
Shares
24
Comments
Share This
Add to
Shares
24
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags