সংস্করণ
Bangla

বহু শিশুর মা হয়ে উঠেছেন উন্মিষের নীতা দেওয়ান

1st Apr 2016
Add to
Shares
8
Comments
Share This
Add to
Shares
8
Comments
Share

২ এপ্রিল, বিশ্ব অটিজম দিবস। আইসিসিআর-এর সত্যজিৎ রায় অডিটোরিয়ামে একটি অন্য ধরনের নাটকের আয়োজন করেছে কলকাতারই একটি সংস্থা। নাম, উন্মিষ। কাহিনির মূল বিষয় অটিজম আক্রান্ত এক শিশুর জীবন। কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাহিনিটি ওই নাটক নয়, বরং ওই সংস্থা। আমরা পথ চলতে, রাস্তায়, বাসে, ট্রেনে, বাজারে অনেক ধরণের মানুষ দেখি। অনেক রকমের। কেউ যদি একটু অন্যরকম তাঁকে আলাদা করে দিতেই অভ্যস্ত কলকাতা। সবাই একদিকে আর সে অন্য দিকে। কিন্তু কলকাতার একটি সংস্থা ওদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে ওদের সামিল করতে কোমর বেঁধে নেমেছেন কলকাতার এক মহিলা উদ্যোগপতি। নাম নীতা দেওয়ান। খুলে ফেলেছেন তাঁর সংস্থা উন্মিষ। আলোর ছোঁয়ায় ফুল যেভাবে ফুটে ওঠে ঠিক সেভাবেই অটিজম বা সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত শিশুদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটায় উন্মিষ।

image


২০০৯ সালে নীতা উন্মিষের প্রতিষ্ঠা করেন। এখন নিউ আলিপুরের একটি ফ্ল্যাটে উন্মিষের কার্যালয়। সেখানে চলছে একটি ওপিডি ক্লিনিক। সেখানেই বিশেষ শিশুদের তিন ধরনের অস্বাভাবিকতার চিকিৎসা করা হয়। নীতা জানালেন, এদের ভিতর রয়েছে ডেভলপমেন্টাল ডিসএবিলিটি, লার্নিং ডিসএবিলিটি এবং আচরণগত বা বিহেভিয়রিয়াল নানা‌ন অস্বাভাবিকতা। ক্লিনিকটিতে রয়েছে এজাতীয় শিশুদের চিকিৎসার জন্যে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। নীতা জানালেন, বেশ কিছু যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনানো হয়েছে। ঘুরিয়ে দেখালেন উন্মিষের ইউনিটগুলি। তার ভিতর আছে, সেরিব্রাল পলসি ইউনিট, অটিজম ইউনিট, সেনসরি ইন্টিগ্রেশন ইউনিট, স্পেশাল এডুকেশন ইউনিউ, লার্নিং ডিসএবেলিটি বা প্রি-ভোকেশনাল ও ভোকেশনাল ইউনিট। 

নীতা বলছিলেন, এক-একটি ইউনিট এক এক ধরনের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে। যেমন ধরুন, প্রি-ভোকেশনাল ও ভো‌কেশনাল ইউনিটটি করা হয়েছে এ ধরনের অস্বাভাবিকতায় আক্রান্ত ছেলেমেয়েদের লাইফ স্কিল ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য মাথায় রেখে। আবার স্পেশাল এডুকেশন ইউনিটটি নিয়মিতভাবে কাজ করছে‌, যে সমস্ত ছেলেমেয়ে অটিজম বা সেরিব্রাল পলসি বা অন্য কোনও ধরনের কম্যুনিকেটিং ডিসঅর্ডারের শিকার তাদের শেখানো হয় রান্নার গ্যাস কিভাবে জ্বালাতে হয় থেকে শুরু করে বাথরুম কিভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবে ব্যবহার করতে হয় সেই সব। কিংবা কিভাবে হাতের লেখা ভাল করা যায় তাও শেখানো হয়।

কীভাবে উন্মিষ গড়ে উঠল এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে সামান্য আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন নীতা, তারপর চোয়াল শক্ত করে জানালেন তাঁর নিজের জীবনের কথা। দুই সন্তানের মা, উচ্চবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ। নীতার একটি সন্তান অটিজমে আক্রান্ত। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আর পাঁচটা মায়ের মতো তিনিও উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সাহসী নীতা আবেগকে বেশি আমল দেননি। বরং পরিস্থিতির সঙ্গে যুঝবার সিদ্ধান্ত নেন। দৃঢ়চেতা এই নারী বৃহত্তর মাতৃত্বের বোধ উপলব্ধি করেন। ঘুরে দাঁড়ান। এবং এভাবেই উন্মিষ তৈরির পরিকল্পনা মাথায় আসে। কম্যুনিকেশন ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুদের জন্য কিছু করতে চাওয়ার চেষ্টাতেই উন্মেষের জন্মবৃত্তান্তের কাহিনি।

image


নীতার অটিজমে আক্রান্ত ছেলেও উন্মেষের নানান পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। অটিজম আক্রান্ত শিশুদের অনেকেরই বুদ্ধিবৃত্তির কোনও সমস্যা থাকে না। বরং, তারা কেউ কেউ বুদ্ধিতে সাধারণের থেকে এগিয়েও থাকতে পারেন। কেউ কেউ অধিক প্রতিভাবানও হতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে ওই শিশু-কিশোরদের মূলত মনের ভাব বিনিময়ের সমস্যাটাই প্রকট হয়। আর পাঁচজন স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করতে পারেন না তাঁরা। নীতার ছেলের বয়স এখন ২১। অটিজম আক্রান্ত হলেও মায়ের হাতে গড়া সংস্থায় প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়েই ইতি‌মধ্যে ‌যথেষ্ট উন্নতি করেছে সে। এ কথা জানালেন উন্মেষের স্পেশাল এডুকেটররা। 

উন্মেষের ওপিডি ক্লিনিকে শিশুকে দেখানো যেতে পারে স্বল্পখরচে। জানা গেল, নাম নথিবদ্ধ করানোর সময় এক হাজার টাকা চার্জ পড়ে। পরের প্রত্যেক সিটিংয়ের জন্যে ৪০০ টাকা ধরে ধার্য করা হয়। যাদের এই টাকাটা খরচ করার সামর্থ থাকে না এমন বহু দরিদ্র পরিবারের মানুষও আসেন এখানে। এ ধরনের শিশুর ক্ষেত্রে উন্মিষ নিখরচায় পরিষেবা দেয়। এভাবেই ধীরে ধীরে নীতা দেওয়ান কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকার অগুণতি বিশেষ শিশুর মা হয়ে উঠেছেন। সহমর্মিতায় আর ভালোবাসায় ভরপুর নীতার মাতৃত্ব।  

image


Add to
Shares
8
Comments
Share This
Add to
Shares
8
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags