সংস্করণ
Bangla

রাজধানীর ফুটপাথের চায়ের দোকানে সাহিত্যের সুবাস

Tanmay Mukherjee
11th Oct 2015
Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share

আমাজনের বেস্টসেলার। ফ্লিপকার্টেও চাহিদা তুঙ্গে। অনলাইন শপিং সাইটে ঝড় তুলে দিয়েছে ‘রামদাস’ এবং ‘নর্মদা’ উপন্যাস। ‘নর্মদা’ আবার ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়ায় বিদেশেও প্রবল আগ্রহ। ২৪টি বইয়ের লেখক তিনি। মিলেছে অজস্র পুরস্কার। এত পরিচিত, স্বীকৃতি। ভাবছেন লেখকটি কে। নিশ্চয়ই কোনও অভিজাত এলাকায় বাস। গগনচুম্বী বাড়ি, আরও কত কী। না, একটু ভুল হবে, এই লেখক এক চা ওয়ালা। দিল্লির ফুটপাথ তাঁর জীবনধারণের জায়গা। জীবন যুদ্ধের অনেক অলিগলি ঘুরে আসা মানুষটি এভাবেই থাকতে ভালবাসেন। তাই নিজের বই নিজেই ফেরি করেন। গত ২৫ বছর ধরে এটাই তাঁর দিননামচা। কাজের মধ্যে কেউ তাঁকে লেখকজি বললে সারাদিনের ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

বিভিন্ন ধরনের কাজের মধ্যে থেকেও রাওয়ের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা ভাঁটা পড়েনি। বুকে একরাশ অভিমান থাকলেও, তাঁর কোনও অভিযোগ নেই। হারতে শেখেননি। তিনি এতেই খুশি যে পাঠকরা তাঁর বই পড়ে। পাঠকদের কাছে বই পৌঁছে দিতে প্রতিদিন সকালে সাইকেলে চেপে প্রায় ৬০ কিলোমিটার চলে যান। চষে বেড়ান দিল্লির এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত। বইয়ের বিক্রির জন্য পৌঁছে যান বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারগুলিতে।

রাওয়ের কথায়, যতক্ষন না লেখকের কেউ খোঁজ নিচ্ছে, ততক্ষণ নিজের পরিচয় দিতাম না। আমার ভাঙাচোরা সাইকেল, ধুলোয় মাখা মলিন পোশাক, সারা শরীর ঘামে ভেজা ছোটখাটো চেহারার লোকটাকে দেখে কোনও প্যাডলার হিসেবে পাঠকরা মনে করতেন। নিজের পরিচয় পাওয়ার পর অবশ্য চাহনিটা বদলে যেত। একটু আগে খাটো চোখে দেখা ক্রেতাদের মুখে তখন শুধুই আগ্রহ। রাওকে নিয়ে তখন কত যত্ন-আত্তি। কেউ এগিয়ে দিতেন চেয়ার। কেউবা যত্ন করে চা দিতেন।

প্রকাশকের ভূমিকায়


image


রাওয়ের প্রথম রচনা ‘নয়ি দুনিয়া কি নয়ি কহানি’। সময়টা ১৯৭৯। নিজের উপন্যাস নিয়ে তিনি প্রকাশকের দরজায় দরজায় ঘোরেন। কেউই তাঁর উপন্যাস ছাপতে রাজি হচ্ছিল না। এক প্রকাশক পাণ্ডুলিপি না দেখেই তাঁকে অপমানিত করেন, কার্যত ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। সেদিন থেকেই রাও প্রতিজ্ঞা করেন বই প্রকাশ করবেন এবং তাঁর বইয়ের বিক্রির ব্যবস্থা করবেন। এরপর থেকে রাও নিজেই লেখক, নিজেই প্রকাশক এবং নিজেই বিপণনকারী। কোনও বইয়ের ১০০০ কপির জন্য ২৫০০০ টাকা খরচ করেন তিনি। ‘বই থেকে আমি যা আয় করি তা অন্য বই প্রকাশের জন্য খরচ করি।’ বলছেন রাও। রাও তাঁর বাকি বইগুলো প্রকাশ করতে বদ্ধপরিকর। ১৩টি বই রয়েছে সেই তালিকায়। ভারতীয় সাহিত্য কলা পাবলিকেশন বলে একটি প্রকাশনা সংস্থার রেজিস্টার করিয়েছেন রাও, যার আইএসবিএন নম্বর রয়েছে। প্রকাশকদের বাইরে অন্যদের কাছে গিয়েও তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল রাওয়ের। এমনকী সুশীল সমাজের কাছে তিনি বই নিয়ে গেলেও তারা বই না দেখেই রাওকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।


image


একজন চা বিক্রেতা এত ভাল লিখতে পারে তা জেনে মেনে নিতে সমস্যা হচ্ছিল তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের। এত তাচ্ছিল্যের পরও রাওয়ের লড়াই থামেনি। নীরবে স্নাতক হওয়ার জন্য পড়াশোনা শুরু করেন। দিনে হাড়ভাঙা খাটুনি, রাতে দোকান, শেষ রাতে রাস্তার আলো নিচে বই পড়া। শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ের স্বীকৃতি জোটে। ৪২ বছরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিন্দিতে স্নাতক হন তিনি। বিএ পাশ করার পরও কল্কে মেলেনি। প্রবীণ মানুষটির কথায়, ‘কেউ বিশ্বাসই করত না, রাস্তার ধারের এক চা-ওয়ালা আদৌ বই লিখতে পারে। তাঁরা বলত ফুটপাথে আবার লেখক থাকে নাকি।’ এটাই ঘটনা যে, ‌রাওয়ের হিন্দি ভাষায় ২০টি বই আছে। হিন্দি ভবনের পাশে ফুটপাথে তাঁর চায়ের দোকান যেন হিন্দি সাহিত্যের ভাণ্ডার।

বইয়ের প্রতি ভালোবাসা


image


তাঁর দোকান একেবারে খোলামেলা, ইচ্ছেমতো সরানো যায়। দোকানে থাকা সামান্য কিছু জিনিস। জং ধরা কেরোসিন স্টোভ, দু থেকে তিনটে পাত্র, একটা প্লাস্টিকের মগ আর কয়েকটা কাপ। আবার এর সঙ্গে স্টলে থাকে রাওয়ের পাঁচটা বই। বৃসষ্টি শুরু হলে দেওয়ালের সঙ্গে প্লাস্টিক জুড়ে দেন রাও। সেই ছাউনির তলায় নিজের বইগুলি ও সাইকেলকে বাঁচান। এর মধ্যেও রাও তাঁর অস্থায়ী দোকানে একবার খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে নেন।

সক্কাল সক্কাল সাইকেলে করে চায়ের দোকানে যান রাও। সকালে দোকানের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন এক ছেলেকে। এরপরই শুরু হয়ে যায় লড়াই। ব্যাগভর্তি বই নিয়ে বেরিয়ে পড়েন স্কুলগুলিতে। বিকেলের পরে ফিরে আবার চায়ের দোকানে বসে পড়েন। ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৮০০ স্কুল রাওয়ের ‌‘টার্গেট’ থাকে। যার মধ্যে ৪০০ স্কুল তাঁর কিছু বই কেনে এবং লাইব্রেরির জন্য রাখে। আর বাকিরা ফিরিয়ে দেয়। ‘কোনও শিক্ষক আমায় বেরিয়ে যেতে বললে আমি রাগ করি না। ভাবি দিনটা আমার নয়, ওনার পক্ষে খারাপ ছিল। তাই কিছুদিন ফের তাঁর কাছে যাই। যতক্ষণ না ওই শিক্ষক আমার বইয়ের প্রতি আকর্ষণ না দেখাচ্ছেন ততক্ষণ ছাড়ি না।’ যে টানাটানিতে চলে তাতে বাস বা রিক্সা ভাড়ার অর্থও থাকে না। তাই প্রখর রোদের মধ্যেও প্যাডেল ঠেলে এগিয়ে যান। রাও বলেন, ‘আমি পয়সা কামানোর জন্য আসিনি। আমি একজন গরিব লেখক হিসেবেই থাকতে চাই। যাদের বইয়ের প্রতি ভালোবাসা নেই সেই সমস্ত ধনীদের থেকে।’

একচিলতে ঘরের মধ্যে স্ত্রী রেখা এবং দুই ছেলে হীতেশ ও পরেশকে নিয়ে থাকেন তিনি। ছেলেরা যতদূর পড়তে চায় তার ব্যবস্থা করেছেন রাও। বিয়ের প্রথম দিকে রাওয়ের লেখা এবং পড়ার প্রতি টান দেখে কিছুটা বিভ্রান্ত ছিলেন রেখাদেবী। কিন্তু তাঁর অধ্যাবসায় দেখে সহধর্মিণী এই লড়াইয়ে সমানভাবে পাশে রয়েছেন। আগে বহু লোকই এসব দেখে বাঁকা চোখে তাকাত। এখন তাদের মুখ বদলে গিয়েছে। বিষ্ণু দিগম্বর মার্গের অন্যান্য চা দোকানিরা কীভাবে দেখেন রাওকে। তাদের কাছে রাও চাওয়ালা নয় আবা দারুণ কোনও লেখকও নয়।

এগোনোর পথ


image


ম‌হারাষ্ট্রের অমরাবতীতে রাওয়ের জন্ম। সেখানেই বেড়ে ওঠা। রাওয়ের তিন ভাই নিজের জগতে সফল। একজন কলেজের লেকচারার। একজন অ্যাকাউনটেন্ট আর শেষের জন পারিবারিক ব্যবসা দেখেন। রাও সে পথে হাঁটেননি। মাত্র ৪০ পয়সা পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। দুনিয়াকে জানতে কোনও পিছুটানই তাঁকে আটকাতে পারেনি। কারণ তাঁকে যে অনেক কিছু জানতে হবে, বই লিখতে এবং পড়তে হবে।

ভোপালে এসে কাজের খোঁজ শুরু করে দেন রাও। প্রথমে চাকর হিসাবে কাজ। বাসন ধোয়া, ঝাঁট দেওয়া, ঘর মোছার বিনিময়ে তিনি পেলেন খাবার, মাথা গোঁজার ঠাঁই আর পড়াশোনার সুযোগ। তাঁকে স্কুলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। আর এভাবে রাত-দিন কাজ করতে করতে ম্যাট্রিক পাশ করে ফেলেন রাও।

সময়টা ১৯৭৫। রাজধানীতে চলে আসেন রাও। এখানেও প্রতি মুহূর্তে জীবনযুদ্ধ। বেঁচে থাকার তাগিদে প্রথম কয়েক বছর নির্মাণকাজে শ্রমিক হিসাবে ও ধাবায় থালা ধোওয়ার কাজ করতেন। ১৯৮০ থেকে দিল্লির আইটি-ওর কাছে হিন্দি ভবনের সামনে ফুটপাথে রাও চা বিক্রি করে চলেছেন। এর ফাঁকেই চলে তাঁর সাহিত্যচর্চা। অবসর তাঁর জীবনে নেই। তবে যেটুকু সময় পান তা কাজে লাগান। দরাজগঞ্জের বাজারে গিয়ে বই ঘাঁটেন। শুধু ভারতীয় লেখকদের বই নয়, শেক্সপিয়ার, বার্নাড শ, গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসদের মতো লেখকদের রচনা পড়ে ফেলেন তিনি।

বিষ্ণু দিগম্বর মার্গ এলাকার বহু অফিস কর্মী রাওয়ের দোকানে নতুন লেখার খোঁজে ঢুঁ মারেন। কাজের ফাঁকে রাওয়ের দোকানে এসে তাঁরা চা খেতে খেতে কিছুক্ষণ আড্ডাও মারেন। অফিসকর্মীদের পাশাপাশি বহু অন্য জগতের মানুষও এখানে আসেন।

রাওয়ের লেখা যে সমাজের সব শ্রেণিকে ছুঁয়ে গিয়েছে তা বোঝা যায় কয়েকজনের কথায়। হিন্দি ভবন এলাকার এক বেসরকারি সংস্থার ম্যানেজার এম শর্মা। প্রতিদিন ঠিক তাঁর রাওয়ের দোকানে আসা চাই। শর্মা বলেন, ‘‘আমার অফিস সফরদরজং-এ। শুধু রাওয়ের দোকানে আসার জন্যই আমি স্কুটার নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। শুধু চা খাওয়াই নয়, এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে আমার। রাওয়ের সঙ্গে আমি খবর, দৃষ্টিভঙ্গী এবং মতামত বিনিময় করি। বাড়িতে ফেরার পর নিজেকে সমৃদ্ধ মনে হয়।’’ শুধু শিক্ষিত অভিজাত সম্প্রদায় নয়, যারা চাকরবাকরের কাজ করেন তাঁদেরকেও বইয়ের নেশা ধরিয়েছেন রাও। এই যেমন শিব কুমার চন্দ্র। এই নিরাপত্তা কর্মী রাওয়ের বইয়ের অনুরাগী। ‘‘রাও-এর লেখা আমার ভাললাগে। বিশেষত ‘নর্মদা’ ও ‘রামদাস’ উপন্যাস আমাকে ছুঁয়ে গিয়েছে। আমি ‌উপন্যাস দুটি বাবাকে দিই, তিনি পড়ে খুব খুশি হয়েছেন।’’ তাঁর সহকর্মীদের কাছেও এই বই নিয়ে গিয়ে ভাল সাড়া পেয়েছেন শিব কুমার। ‘নর্মদা’ ও ‘রামদাস’ অনলাইন শপিংয়ে দারুণ সাড়া ফেলে দিয়েছে। ‘নর্মদা’ ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়ায় দেশের বাইরেও চাহিদা তৈরি হয়েছে। অ্যামাজন, ফ্লিপকার্টের মতো অনলাইন পোর্টালে তাঁর এই দুটি বই একেবারে হটকেক। অনলাইনে বিক্রির ব্যাপারটা রাওয়ের এক ছেলে দেখেন।

রাওয়ের বই উঠে আসার কথা বলে। তবে সেখানে অনটন নিয়ে রাওয়ের নিত্য লড়াইয়ের কথা নেই। এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন ধনীরা। যাঁদের লড়াই আসলে রূপক অর্থে তুলে ধরা। রাওয়ের লেখা তাঁর জীবন নিয়ে নয়, কিন্তু সবকিছুই বাস্তবিক। নিজের দর্শনকে লেখার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেন রাও। প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক গুলশন নন্দা ছিলেন রাওয়ের প্রেরণা।গুরুর পথেই এগোতে চান শিষ্য|

Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags