সংস্করণ
Bangla

ব্যস্ততা এবং দাম্পত্যের মধ্যে ভারসাম্য থাকুক

YS Bengali
1st Dec 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

এখন অধিকাংশ স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ব্যবসায়ী বা চাকুরিজীবী। সাংসারিক জীবনের সুখ-শান্তির এখন সংজ্ঞা বদল হয়েছে। সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে উন্নতির শিখর ছুঁতে হয় নারী পুরুষ নির্বিশেষে। 

অন্যদিকে পরিবারগুলিতে সৃষ্টি হয় জটিল সব সমস্যা। কাজ আগে না সংসার? ডিম আগে না মুরগি আগের ধাঁধা! দু'জনেই কিভাবে ভাগ করে নেবেন দায়িত্ব? মা-বাবার থেকে কী শিক্ষা নেবে পরবর্তী প্রজন্ম? সেক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। কঠিন বাস্তবের এই সমস্যা নিয়েই কাশ্যপ দেওরার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ, দ্য গোল্ডেন ট্যাপ-ইনসাইড স্টোরি অফ হাইপার-ফান্ডেড ইন্ডিয়ান স্টার্টআপস।

image


সময়োপযোগী এই গ্রন্থে এ যুগের ব্যবসায়ীদের সাংসারিক জীবনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতির পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে মনস্তাত্বিক দিকটিও। কী ভাবে সাংসারিক ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, তার উপর বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে। গ্রন্থটির কিছু বাছাই করা অংশ ইয়োরস্টোরির পাঠকদের জন্য:

আপনি যদি ভারতীয় প্রযুক্তি-ব্যবসায়ী হন, তা হলে, সম্ভাবনাটি হল, আপনি পুরুষ এবং আমারই মতো শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এক জন মানুষ। আপনার বাবার পেশাগত জীবনে ধীরে-ধীরে উন্নতি হয়েছে এবং স্বচ্ছল সংসার চালাতে প্রাণপাত পরিশ্রম করে উপার্জন করেছেন। আমার মায়ের মতোই, আপনার মা-ও একার হাতে সংসার সামলেছেন, আপনাকে যথার্থ শিক্ষিত করে তুলতে চেয়েছেন। তাঁদের যৌথ চেষ্টায় উচ্চ-উপার্জনের যোগ্য হয়ে উঠেছেন আপনি। এবং আপনার মা-বাবার চাইতেও জীবনে কিছু করে দেখানোর অনেক বেশি সুযোগ পেয়েছেন। আপনি যদি বিবাহিত হন, তবে আশা করা যায়, আপনার স্ত্রী-ও আপনারই মতো যথার্থ শিক্ষিত হয়ে উঠতে পেরেছেন। এবং তা সম্ভব হয়েছে তাঁর মা-বাবা পাশে ছিলেন বলেই। কিন্তু আপনাদের মায়েদের সঙ্গে আপনার স্ত্রী-র মানসিকতার ফারাক রয়েছে। আশা করা যায়, আপনাদের মায়েদের কেউই চাকরি করতেন না, বা করেন না। কিন্তু আপনার স্ত্রী চাকরি করেন, কিংবা করতেন । যদি সাংসারিক কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়ে থাকেন, তবে তিনি পুনরায় প্রবলভাবে কর্মজীবনে ফিরে যেতে চান। কারণ আপনার স্ত্রী আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী থাকতে পছন্দ করেন। আর সেই জন্যই, আপনার প্রয়োজন কর্মজীবন এবং দাম্পত্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা।

জীবের সহজাত প্রবৃত্তি হল নিজের মা-বাবাকে অনুসরণ করা। সেই কারণেই মা-বাবা কী করতে বলছেন, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এবং অনুসরণযোগ্য হয়ে ওঠে মা-বাবা কী করছেন। শৈশবকাল থেকেই এক জন সামাজিক পুরুষের মস্তিষ্কে প্রোথিত হয় সেই ধারণা, যা তাকে বলে উপার্জনক্ষম হতে। কারণ, সে জেনে যায়, উপার্জন করে সংসার টানতে হয় পুরুষমানুষকেই। একই ভাবে নারীও জেনে যায় সংসারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দেখভালের দায়িত্ব তারই। এ যুগের স্বাধীনচেতা উপার্জক নারীপুরুষের বিভেদরেখা আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যমান না-হলেও, প্রবৃত্তির চোরাটান থেকেই যায়। আর সেই কারণেই সৃষ্টি হয় নানা জটিলতার। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কি সত্যিই আছে?

ধরা যাক স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দায়িত্ব মিলেমিশে পালন করেন। কিন্তু এই অবস্থায় স্ত্রী যদি কর্মক্ষেত্রের সাফল্যে স্বামীকে ছাড়িয়ে যেতে চান, তখনই সৃষ্টি হয় জটিলতার। কর্মক্ষেত্রে স্ত্রীর উন্নতির জন্য তাঁর সাংসারিক কাজে সহায়তা করাকে কর্তব্য বলে মনে করতে থাকেন স্বামী। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর মনে হতে থাকে, তাঁর মাকে সাংসারিক কাজে এতোটা সহায়তা পিতৃদেব কখনোই করেননি। একই ভাবে স্ত্রীর মনেও এক ধরনের অপরাধবোধ তৈরি হয়। তাঁর মনে হতে থাকে, তাঁর মা যেভাবে সংসারের দায়-দায়িত্ব পালন করতেন, তিনি নিজের জীবনে তা পারছেন না। আর এভাবেই নানা জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নষ্ট হয় সংসারের ভারসাম্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের চালচলন, প্রতিটি পদক্ষেপই আমাদের সন্তানসন্ততির অবচেতনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলছে। কারণ তারা আমাদের অনুসরণ করছে।

ব্যবসায়ীদের সাংসারিক জীবন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে স্বামী-স্ত্রীর মানসিক টানাপোড়েনে দুর্বিষহ। বিশেষ করে শুরুয়াতির ব্যবসায় তীব্র মানসিক উদ্বেগ থাকে। এই সময় প্রয়োজন হয় স্ত্রীর সান্নিধ্য। নিজের পেশাগত জীবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে ব্যবসায়ী স্বামীর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করেন স্ত্রী। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে তাঁর মনে হয়, এই স্বার্থত্যাগের প্রতিদান হিসেবে তিনি স্বামীর কাছ থেকে কিছুই পাচ্ছেন না। এই সব ক্ষেত্রে পুরুষের মনে সংসারে তাঁর ঐতিহ্যগত ভূমিকা ও লালিত উচ্চাকাঙ্খার ভিতর এক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এবং মানসিকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন তিনি। এক সময় অনিবার্যভাবেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে ফাটল ধরে, ভেঙে যায় সংসার। আর এই ব্যাপারটি বেশি ঘটে ব্যবসায়ীদের জীবনে। এবং তাঁদের দাম্পত্য জীবনে এই ঘটনা অস্বাভাবিকও নয়।

তবে, এই সমস্যা অনেকটাই কম সেই সব সংসারে যেখানে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই উপার্জন করেন। স্বামী ব্যবসায় ঝুঁকি নিতে পারেন তখনই, যখন তাঁর স্ত্রীও উপার্জক। স্ত্রী ব্যবসায়ী হলে, ঝুঁকি নেওয়ার প্রশ্নে, একই ভাবে নিরাপত্তা দেন রোজগেরে স্বামী। ঝুঁকি বহুল জীবন যে সব দম্পতির পছন্দ, তাঁরা অবশ্য পৃথক ব্যবসা করেন। কিন্তু সমস্যার সৃষ্টি হয় তখনই, যখন সংসারের চাইদা মেটাতে স্ত্রী কিংবা স্বামীকে নিজেদের পেশাদার জীবনের স্বার্থত্যাগ করতে হয়।

আচ্ছা ভেবে দেখুন তো এক বার। আপনি পেশাগত জীবনের উন্নতির লক্ষ্যে ক'বার ভৌগলিক স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? আপনি পুরুষ। নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, ক'বার এই ধরনের সিদ্ধান্ত আপনার স্ত্রী নিয়েছেন। নতুন শহরে গেলে আপনার ব্যবসার উন্নতি হবে। এই ভাবনা কি শুধু আপনার নয়? কত বার নিজের পেশাগত জীবনকে জলাঞ্জলি দিয়ে আপনার সঙ্গ নিয়েছেন আপনার স্ত্রী? স্বামী-স্ত্রী কেউই যখন নিজেদের পেশার ক্ষতি করতে রাজি হননি, এবং একে অপরের থেকে দূরে থাকাকেই শ্রেষ্ঠ মনে করেছেন, তার পরিণতি কী হয়েছে?

এবার সংসারের ভারসাম্য নিয়ে একটু ভাবুন। কী ভাবে বাঁচানো যায় একটি সংসার? আমার কাছে এর কোনও নির্দিষ্ট উত্তর নেই। স্বামী না স্ত্রী, কে কত স্বার্থত্যাগ করেছেন? মেধা কার বেশি? এ সব নিয়েই কি ভাবব? নাকি ফিরে যাব সংসারে স্বামী-স্ত্রীর সেই ঐতিহ্যগত ভূমিকায়? এটি একটি সুযোগ, এই বিষয়ে ভাবনার, ভাবুন।

প্রতিটি দাম্পত্যেই সঠির ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। সেটা ঠিক করে নিতে হবে নিজেদেরই। সংসারে নারী-পুরুষের ঐতিহ্যগত ভূমিকার দিন আর নেই। পেশা এবং দাম্পত্যের ভারসাম্য রক্ষাই এই প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের দিকেই তাকিয়ে।

লেখকের কথা: আমাদের বিয়ের পর, শ্রুতি গাল্ফে চলে যায়। এর দু-বছর পর আমরা মুম্বাইয়ে থাকতে শুরু করি। কারণ, সেখানে আমি চৌপাটি বাজার শুরু করতে পারব। এ বছরের শুরুতে আমরা ফের শহর বদল করে চলে যাই দিল্লি। কারণ, আমার স্ত্রীর সেখানেই কাজ, সিইআরসি-র সঙ্গে। কোন শহরে আমাদের স্থায়ী ঠিকানা তা নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত তর্ক করি। আর ব্যক্তিজীবনের এই সব প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়েই আমার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থটি।

(লেখা- কাশ্যপ দেওরা, অনুবাদ- দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়)

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags