সংস্করণ
Bangla

ছত্রধরের ছেলে ফুটবল আঁকড়ে মাথা তুলছেন

19th Feb 2016
Add to
Shares
6
Comments
Share This
Add to
Shares
6
Comments
Share

ছত্রধর মাহাতোর বড় ছেলে ধৃতিপ্রসাদ স্বপ্ন দেখছেন এমন একদিন আসবে যেদিন লোকে বলবে ছত্রধর ধৃতিপ্রসাদের বাবা। ধৃতি ফুটবলার। কলকাতার মাঠে খেলেন। ফার্স্ট ডিভিশন। কিন্তু বড় কোনও ক্লাব নয়। ধৃতিকে লালগড় থেকে ডেকে এনে বাছাই করা হয়েছে বলেই ওই ক্লাবের নাম এখন খেলার দুনিয়ার বাইরের লোক জানেন। মেসারার্স ক্লাব। হাজার তিনেক টাকা স্টাইপেন পান ধৃতি। সহায় সম্বলহীন মাহাতো পরিবারের এটাই একমাত্র আয়। ছত্রধরের স্ত্রী সেলাই মেশিনে কিছু কাজ করেন ঠিকই কিন্তু তাতে সংসার আগেও চলত না এখনও চলে না। এই তিনহাজার টাকায় শেয়ার আছে তিনটি প্রাণীর। মা-ভাই এবং ধৃতির। যদিও হাওড়া ক্লাবের যে মেসে থাকেন ধৃতি, সেখানে খাই খরচা দিতে হয় না। ছত্রধরের ছেলে বলে কথা...।

image


রাজনীতি, সমাজনীতি, দেশদ্রোহিতা, দেশপ্রেম, পুলিশ, মাওবাদী, গুমখুন, সত্যি, মিথ্যে, বোকালোক, ভরসা, বিশ্বাসঘাতকতা, সহানুভুতি, দল, ক্লাব সব দেখে ফেলেছেন বছর কুড়ির ধৃতি। খেতে পাওয়া না খেতে পাওয়াও দেখে ফেলেছেন। পর পর তিন দিন শুধু ভাতের ফ্যান খেয়ে থেকেছেন। মা শুতে গেছেন শুধু জল খেয়ে। সারারাত গুলির আওয়াজে কানের পর্দা ফেঁটে যাওয়ার উপক্রম। সারারাত শিটিয়ে থেকেছেন। এবার তিন কাঠিতে গোল দিয়ে সেসব চুকিয়ে দেবেন। 

ও কোনওদিনই পায়ে বল নিয়ে মাঠে দৌঁড়বেন, দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। চিরকাল স্পাইডার ম্যান হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। বুক চিতিয়ে, সমস্ত শরীর দিয়ে, সমস্ত একাগ্রতা, নিষ্ঠা, সততা, দায়বদ্ধতা দিয়ে দলের হয়ে গোল বাঁচাবেন এটাই স্বপ্ন দেখতেন লালগড় আন্দোলনের নেতা ছত্রধর মাহাতোর বড় ছেলে ধৃতিপ্রসাদ মাহাতো। কিন্তু ও এখন উইংহাফ পোজিশনে খেলেন। বল পায়ে পেলেই দৌড়ন। দু’প্রান্ত দিয়ে বল নিয়ে দৌড় দৌড় দৌড়। ডিফেন্ডারকে চুক্কি দিয়ে, স্লাইড ট্যাকেল করে, কাট করে পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পরার অদম্য চেষ্টা করেন ছেলেটা। গোল দিতে চান। লম্বা লম্বা শট নেন। সেসব পাওয়ার ফুল শট। স্ট্রেট লাইন। ওর কিকের সামনে প্রতিপক্ষের গোলকিপার নার্ভাস হয়ে যায়। ওর পা চলে একটাই লক্ষ্যে। ও এখন শুনতে চান ওর শটের পর গোটা স্টেডিয়াম চিৎকার করে বলে উঠবে "গোল"। এত জোড়ে চিৎকার করবে যাতে যারা ঠান্ডা ঘরে বসে জ্যাঠামো করেন তারাও যেন শুনতে পান। জানতে পারেন। ছত্রধরের ছেলে ধৃতিপ্রদাস একজন ফুটবলার এবং যেকোনও সময় গোল দিতে পারেন।

কথায় কথায় বেরিয়ে এল বছর পাঁচেক আগে বায়ার্ন মিউনিখে প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়াটা কিভাবে কেঁচে গিয়েছিল ওঁর। জার্মানি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন তারই স্কুলের অপর এক সতীর্থ। যে এক মাস মিউনিখে থাকার পর দেশে ফিরে ফুটবলই ছেড়ে দিয়েছিল। অমলিয়া গ্রামে ওদের মাটির বাড়ির দেওয়ালে ভারতের আন্তর্জাতিক গোলরক্ষক সুব্রত পালের একটি ছবি লাগানো ছিল। ধৃতির স্বপ্নের স্পাইডারম্যান। হাওয়ায় একদিন সেই ছবি উড়ে গিয়ে পড়েছিল রাস্তায়। ঘর থেকে বেরিয়ে ধৃতি ছুটেছিলেন সেই ছবি আনতে। কিন্তু রাস্তায় গিয়ে দেখেন, কুচকাওয়াজ করছে পুলিশ। বুটের তলায় চলে গিয়েছে ছবিটা। ওই পুলিশটিকে অনুরোধ করেছিলেন, বুট দিয়ে ছবিটা না ছিঁড়তে। বড় বড় চোখ করে কনস্টেবলের পাল্টা উত্তর ভবিষ্যতে কখনও এরকম সন্দেহভাজন লোকের ছবি রাখলে তাকেই মাওবাদি বলে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। "হায়রে পোড়া কপাল... মুড়ি মুড়কি..চিনি মিছরি এদের কাছে সবই সমান।" অতি দুঃখে বলছিলেন ধৃতি।

পাশাপাশি বলছিলেন, এখন নাকি পরিস্থিতি একটু থিতু। ভাইকে লালগড় বিদ্যাপীঠের হস্টেলে ভর্তি করে দিয়েছেন। মাকেও একটা সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছেন। আর ও তো দাপিয়ে কলকাতার মাঠ। এখন ওর স্বপ্নের লক্ষ্য "Goal"...।

Add to
Shares
6
Comments
Share This
Add to
Shares
6
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags