সংস্করণ
Bangla

তিন ইয়ারি কথা এবং "সম্পূর্ণ আর্থ"

11th Sep 2015
Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share

দেবার্থ ব্যানার্জী, জয়ন্ত নটরাজু এবং ঋত্বিক রাও তিনজনই পেশায় ইঞ্জিনিয়র। সমাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই শহরের বর্জ্য দূর করতে এগিয়ে আসেন। প্রতিষ্ঠা করেন "সম্পূর্ণ আর্থ" নামের একটি সংস্থা। প্রথম প্রথম মানুষ বিরক্তি ও উদাসীনতাই দেখাতো। এঁদেরই এক ক্ল্যায়েন্ট বিজয়া শ্রীনিবাসন আমাদের বলেছেন প্রতিবেশীরা দুটি ব্যাগে আলাদা করে আবর্জনা ভরতেই চাইত না। 

দেবার্থ ব্যানার্জী,জয়ন্ত নটরাজু  এবং ঋত্বিক রাও

দেবার্থ ব্যানার্জী,জয়ন্ত নটরাজু এবং ঋত্বিক রাও


মুম্বই এ তাঁদের এই সংস্থা মানুষের আচরণগত পরিবর্তন আনতে টানা ছ'মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। সংস্থার ডিরেক্টর দেবার্থ বলছিলেন মানুষের উচিত অনেক সতর্ক ভাবে আবর্জনা ব্যাগে জমানো এবং নিজেদের উঠোনে, রাস্তায়, ড্রেনে ময়লা একদমই না ফেলা। এখনও অনেক পথ পেরনো বাকি সম্পূর্ণ আর্থের। তবে সংস্থার কর্তারা আশাবাদী সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন আসবেই।

বর্জ্যের পুনর্ব্যবহার ও তার অর্থকরী গুরুত্ব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে পারলে কাজটা সহজ হতে পারে বলে মনে করেন দেবার্থ।

দেবার্থদের অনুপ্রেরণা মার্কিন নাট্যকার অ্য়াব্রাহাম সেট্রাকিয়ানের একটি নাটক। "দি স্ট্রেইন"। সেখানে ভ্যামপায়ার রূপকের সাহায্যে সেট্রাকিয়ান দেখাচ্ছেন,"ভালো কিছু করার ইচ্ছে থাকলেই চলে না ভালো কাজ করতেই হয়।নইলে কীসের ভালো মানুষ?" পরিবেশ দূষণ কীভাবে জীবজগতের সঙ্কট বাড়াচ্ছে সেকথাই তাঁর নাটকে বলতে চেয়েছেন সেট্রাকিয়ান। মাথায় গেঁথে গিয়েছিল দেবার্থদের। ভালো কাজ।

বর্জ্য পদার্থ ঠিক ভাবে সংগ্রহ করে পৃথিবী কে পরিবেশ দূষণের হাত থেকে বাঁচানোটা যে জরুরি সেটা অনুভব করতে শুরু করেন ওঁরা। আর তাই তৈরি হয় তাঁদের প্রকল্প।

কয়েকটা জিনিস ওঁদের মাথায় ছিল 

  1. প্রতিদিন ভারত প্রায় এক লক্ষ মেট্রিক টন আবর্জনা তৈরি করে। 
  2. জীবাণু-বিয়োজিত আর্বজনায় থাকে প্রচুর পরিমানে বিষাক্ত মিথেন গ্য়াস। 
  3. কাগজ কুড়ুনিদের ভূমিকা সমাজে অনবদ্য। তবুও প্রতিদিন অকথ্য অপমান সহ্য করতে হয় তাঁদের।
  4. এই কাজ ঠিক ভাবে করতে ওদের অর্থের প্রয়োজন।
  5. শুধু মিউনিসিপ্যালিটি নয়, বড় বড় সংস্থার সঙ্গেও গাঁটছড়া বাঁধতে হবে।

এই সবগুলো কথা মাথায় রেখেই "সর্ম্পূণ আর্থ" কাজে নেমেছিল। কাগজ কুড়ুনিদের ওঁরা নিয়োগ করেছেন ওয়েস্ট ম্যানেজার পদে। এঁরা বেতন পান এবং ইউনিফর্ম পরে কাজ করেন।

দেবার্থ পুণের সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। অবসর সময়ে NGO তে কাজ করতেন। তাঁর মধ্যে পরিবেশ প্রেম ও সমাজসচেতনতা ছিল প্রবল। টাটা ইনস্টিটিটিউট অফ্ সোসাল সাইন্স এ সমাজ বিজ্ঞান নিয়ে মাষ্টারর্স করেন তিনি।২০১০ এ তাঁর সহপাঠী ছিলেন ঋত্বিক আর জয়ন্ত। এঁরা প্রত্যেকে প্রযুক্তিবিদ। তিন বন্ধু মিলেই ভারতকে স্বচ্ছ করার অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রথমে বর্জ্য সংগ্রহকারীদের হয়ে যোগ দেন "স্ত্রী মুক্তি সংগঠন" নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায়। তারপর এক এক করে তৈরি হয়ে যায় টিম।

মুম্বই এ পাড়ায় পাড়ায় ঘোরে এঁদের ময়লা নেওয়ার গাড়ি। মুম্বই মিউনিসিপাল কর্পোরেশন ও "পরিসর ভগিনী বিকাশ কেন্দ্র" নামের একটি আবর্জনা সংগ্রহকারী সংস্থা তাঁদের সঙ্গে যুক্ত। ডি বি এস ব্যাঙ্ক দেবার্থদের সঙ্গে প্রথম থেকেই আছে। ক্ষতিপূরণ থেকে দেনাশোধ সবেতেই এই ব্যাঙ্ক এঁদের পাশে থেকেছে। সম্পূর্ণ আর্থ ওয়েস্ট অডিট এবং বর্জ্য রিসাইকেল থেকে তৈরি স্টেশানারি সামগ্রী বিক্রি করে।

দেবার্থ বলছিলেন ২০১২ সাল থেকে কাজ চলছে। সরকারের "সচ্ছ ভারত অভিযানে ভূয়সী প্রশংসা করেন দেবার্থ। কিন্তু ওরা যখন এই অভিযানে নামেন তখন স্বচ্ছ ভারত মিশন ছিল না। পরিচ্ছন্নতা নিয়ে এতো প্রচার ছিল না। ফলে সাধারণ মানুষকে সচেতন করাও বেশ কঠিন ছিল। ঋত্বিক আর জয়ন্ত সংস্থার নাম রেখেছিলেন সংস্কৃতে। সম্পূর্ণ মানে গোটা। আর আর্থ ইংরেজি শব্দ। এর মানে পৃথিবী। ফলে শুধু ভারত নয়। ওরা স্বপ্ন দেখেন স্বচ্ছ পৃথিবীর।

কিন্তু আর্বজনা সংগ্রহ আর পৃথকীকরণের কাজটা একসাথে করাটা যে কত কঠিন প্রতি পদে টের পান ওঁরা। টের পান এই কাজে অনেক সামাজিক আর আর্থিক সাহায্য দরকার। মানুষ নির্বিচারে যেখানে খুশি ময়লা ফেলতে অভ্যস্ত। পরিবেশদূষণ নিয়ে না ভাবতেই অভ্যস্ত মানুষ। কারণ এর ক্ষতিকর ফল তাঁদের জানা নেই। এরমধ্যে সুখের কথা কিছু বড় সংস্থা বায়োগ্য়াস রিসাইক্লিং নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছিল ওই সময়। ফলে আর্থিক ভাবে সংস্থাকে চাঙ্গা করতে এরকম বেশকিছু স্টেক হোল্ডারদের সাথে যুক্ত হন দেবার্থরা।

এখন এটা একটা লাভজনক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। আবর্জনা সংগ্রহকারীদের ট্রেনিং দেওয়া হয়। এঁরা কাজ করেন মিউনিসিপাল কর্পোরেশন ও বিভিন্ন কর্পোরেট হাউসের সঙ্গে। পাশাপাশি শিক্ষামূলক অভিযানও চালানো হয়।

সংস্থার বহু ব্যবসায়িক প্ল্যান সফলতা পাচ্ছে। এখন তাঁদের একশোরও বেশী ক্লায়েন্ট। গত তিন বছরে আশিটা ক্লায়েন্টের জন্য, কর্পোরেট হাউস, হাউসিং সোসাইটি, হোটেল, হাসপাতাল এবং শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। দ্য ক্যাপিটাল (বান্দ্রা কুর্লা কমপ্লেক্স) এবং এডল্যাবস্ ইমাজিকারের মতো কর্পোরেট পার্কে তাঁরা বর্জ্য পরিচালনের দায়িত্ব পেয়েছেন। 

দেবার্থরা যুক্ত TISS, টাটা পাওয়ার থারমাল পাওয়ার স্টেশন, এন্ড টাটা কন্সালটেনসি সার্ভিস্ পাওয়াই ক্যামপাসের সাথে। চেম্বুর,ব্যান্দ্রা ও নভি মুম্বইের অনেক কলেজ এবং বসতি এলাকায় কম্পোস্টিং পিট বানিয়েছেন ওঁরা। এছাড়াও রিলায়েন্স কর্পোরেট পার্ক, এক্সিস ব্যাঙ্ক, মাহিন্দ্রা এন্ড মাহিন্দ্রা, বাজাজ ইলেক্ট্রিক্যালস্, মহানগর গ্যাস, আরনেস্ট এন্ড ইয়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত। কিছু বড় রিয়েল এস্টেট কোম্পানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের নকশাও করেছে সম্পূর্ণ আর্থ। মহারাষ্ট্রের মিউনিসিপাল এলাকার কাজও তাঁরা করছেন হাসিমুখে। 

দেবার্থ,ঋত্বিক আর জয়ন্তরা প্রমাণ করে দিয়েছেন জনকল্যান করার মতো সৎ ইচ্ছার কোন বিকল্প হয় না।

ভবিষ্যতের ভাবনা

শুরুয়াতি উদ্যোগপতিদের জন্য অনেক প্ল্যান আছে ওঁদের। রোজ একা মুম্বাই-ই দশ হাজার মেট্রিক টন আবর্জনা তৈরি করে। ফলে এখানেই কাজের সুযোগ ১০০০ গুণ বেশি। ভারতের অন্য প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁরা বায়ো-গ্যাস্ প্লান্ট বানানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন। শহরতলী ও গ্রামে তাঁদের কাজ ছড়াচ্ছে। তাঁরা লোকালয়ে ফ্র্যানচাইজি কে দায়িত্ব দিতে চাইছেন। ইতিমধ্যে তাঁরা দিনে ২০ ও ৫০ কিলো ক্ষমতা সম্পন্ন বায়ো গ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করেছেন। এঁরা যদিও স্বনির্ভর সংস্থা তবুও DBS, টাটা ইনস্টিটিউট অফ্ সোসাল সাইন্স্ এবং আনলিমিটেড ইন্ডিয়া এঁদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে দিনের শেষে দেবার্থ বিশ্বাস করেন ব্যর্থ হওয়ার ভয়ে নিজের স্বপ্নের পিছন ধাওয়া ছেড়ে দেওয়াটা পাগলামি।


Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags