সংস্করণ
Bangla

নারীপাচার রুখতে লীনার হাতিয়ার তাঁর শিল্প

6th Nov 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

বড় শহরের স্কাইলাইন ধরে বিশাল সব ঘরবাড়ি। তারই মধ্যে থেকে কালো কাটআউটে ফুটে উঠছে এক নারীর অবয়ব। খানিকটা ছায়ার মতো। যেন অদৃশ্য হাতছানি দিয়ে বলতে চাইছে গোপন কোনও কথা। যেন বলতে চাইছে,"তোমাদের এই বিশাল দুনিয়ায় আমি হারিয়ে যাচ্ছি। একবার আমার দিকে ফিরে তাকাও।" ভাবছেন ইওর স্টোরিতে এ আবার কেমন স্টার্ট আপ? এক কথায় এও এক স্টার্ট আপ। এমন এক শুরুয়াতি প্রকল্প যারা এই পৃথিবীতে হারিয়ে যেতে বসা হাজার হাজার মেয়েকে জীবনের মূল স্রোতে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চায়। শুধুমাত্র শিল্পের হাত ধরে। কারণ এই ভাবনার জন্মদাত্রী লীনা কেজরিওয়ালের প্রতিবাদের ভাষা তাঁর শিল্পই। তিনি একাধারেচিত্রশিল্পী এবং চিত্রগ্রাহক। গত কয়েক দশকে কাজের মধ্য দিয়ে সঞ্চিত সব অভিজ্ঞতা যিনি নিংড়ে দিয়েছেন নিজের মিসিং পাবলিক আর্ট প্রজেক্টে।

image


এই প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে গেলে আগে লীনার জীবনের কথা জানতে হবে। ষাটের দশকের শেষের দিকে কলকাতার এক মারওয়াড়ি পরিবারে জন্ম তাঁর। ছয় ভাইবোনের পঞ্চম লীনা। ছোটবেলার পুরোটাই কেটেছে রাজস্থানের জয়পুরের এক বোর্ডিং স্কুলে। লীনার মতে, এই স্কুলের পরিবেশই তাঁকে সমাজের বৃহত্তর বিষয়গুলি চিনতে শিখিয়েছিল। বিভিন্ন ধরণের মানুষ, তাঁদের মানসিকতা, আচার-আচরণ সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখিয়েছিল। "আমি ছোটবেলা থেকেই শিল্পের অনুরাগী। কিন্তু জীবনে অ্যাম্বিশন বলতে কিছুই ছিল না। কিছু করতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, এসব ভাবিই নি কোনওদিন," জানালেন লীনা। তিনি আরও বলেন, "স্কুল শেষ করে কলকাতায় ফিরে আসি, লরেটো কলেজে ভর্তি হই। সেইসময় আমার আগ্রহ দেখেই বাড়িতে একজন আঁকার শিক্ষক রাখা হয়। তাঁর কাছেই হাতেখড়ি।" ধীরে ধীরে অয়েল পেন্টিং, পোর্টে্রট, এবং বিভিন্ন শেডের রঙের সঙ্গে পরিচয় ঘটতে থাকে। তবে ছবি আঁকার পুরোটাই করতেন নেহাতই খেয়ালবশে। কলেজ পাশ করে অ্যাডভার্টাইজিং নিয়ে কিছুদিন পড়াশুনো করেন। তবে চাকরির কথা ভাবেন নি। তবে তখন তিনি ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছেন, ছবির দুনিয়া তাঁকে টানে। শুধু ছবি আঁকা নয়, ছবি তোলা নিয়েও তাঁর কৌতূহলের শেষ নেই। বিড়লা ইন্স্টিটিউটে ছোট একটি ফোটোগ্রাফি কোর্সে ভর্তি হন। আর সেখান থেকেই জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে।

নিজেকে একরকম নতুন করে আবিষ্কার করেন লীনা কেজরিওয়াল। অ্যামেচার ফটোগ্রাফার হিসেবে ছবি তুলতে শুরু করেন। এই সময়ই কলকাতা শহরকেও নতুন করে চিনতে শেখেন তিনি।‌ শহরের রাজপথ নয়, অলি, গলিতে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যকে অনেক বেশি আপন মনে হতে থাকে তাঁর। এই সময়ই বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। তবে নিজের ভালো লাগা থেকে কোনওভাবেই ফোকাস সরে যায়নি তাঁর। ১৯৯৯ সালে আলিপুর রোডে নিজের বাড়িতেই ছোট একটি স্টুডিও তৈরী করেন লীনা। এর কিছুদিনের মধ্যেই পারিবারিক পরিচিতির সূত্রে হঠাৎই একটি সুযোগ পেয়ে যান। পারিবারিক বন্ধু, লেখিকা অলকা সরাওগি লীনাকে প্রস্তাব দেন, তাঁর বই Kalikatha via Bypass এর প্রচ্ছদের ছবি তোলার। সুযোগ পেয়েই মাঠ নেমে পড়েন লীনা। ২০০২ সালে প্রকাশিত হয় বইটি - যা সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এনে দেয় লেখিকাকে। আর লীনার কাজও নজর কাড়েসবার। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। কয়েক বছর ধরে চলতে থাকা শখের ছবি তোলাই হয়ে উঠল তাঁর প্রফেশন। সেই কাজের পরিধি বাড়তে বাড়তে আজ তিনি British Institute of Professional Photography (LBIPP) এবং Photographers Guild of India (PGI)-র স্বীকৃত সদস্য। সেই সঙ্গে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করেছেন একজন ইনন্স্টলেশন আর্টিস্ট হিসেবেও।

image


তবে নিজের প্রথম বড় প্রজেক্টের পর থেকেই ছবি তোলার পাশাপাশি আরও বেশ কিছু বিষয় উপলব্ধি করতে শুরু করেন লীনা। কলকাতা শহর তাঁকে ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করে। শুধু তাই নয়, এশহরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন বিষয় জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেন তিনি। সেই অনুভূতি থেকেই জন্ম নেয় তাঁর প্রথম বই Calcutta: Repossessing the City। কাজের সূত্রে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। ধীরে ধীরে তাঁদের সঙ্গেও কাজ করতে শুরু করেন লীনা। আর এই পুরো অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় নতুন এক ভাবনা। শুধুমাত্র কলকাতা নয়, কাজের সূত্রে দেশ এবং বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করতে হয়েছে তাঁকে। প্রতি ক্ষেত্রেই তিনি উপলব্ধি করতে থাকেন, মহিলাদের অসহায়তার কথা। কলকাতা, মুম্বই বা প্যারিস। প্রত্যেক শহরেরই কিছু না বলা কথা রয়েছে। রয়েছে একটা অন্ধকার দিক। যেখানে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হচ্ছেন মহিলারা। মাটিতে মিশিয়ে যাচ্ছে তাঁদের সম্মান। "আচ্ছা আপনি ভাবুন তো, সকালে অফিসে যাওয়ার আগে থেকে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত কতটা সময় আমরা সবজির দাম বাড়ল না কমল বা প্যাসিভ স্মোকিং স্বাস্থ্যের পক্ষে কতটা ক্ষতিকর তা নিয়ে ভাবি? কিন্তু প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় রাস্তার ধারে, ট্রাফিক সিগন্যালে যে মেয়েগুলো মুখে রং মেখে দাঁড়িয়ে থাকে তাদের কথা একবারও ভাবি? সিগনালে গাড়ি দাঁড়ালেই যে ছোট্ট মেয়েটা ফুল হাতে দৌড়ে আসে তাকে দেখে কোনওদিন আমাদের কষ্ট হয়? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়না। আর সেটাই আমাকে ভাবায়," বললেন লীনা। সত্যিই তো, আপনারা ভেবে দেখেছেন কখনও? মানবাধিকার, গণতন্ত্র, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নারী পুরুষের সমান অধিকার নিয়ে আপনি চায়ের কাপে তুফান তোলেন। কিন্তু দোকানের বেঞ্চে আপনার সামনে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি সত্যিই ভিক্ষে করতে চায় কি না তা তো ভাবেন না। কিংবা এই যে এত এত মেয়ে রোজ এই কাজ করছে তারা কোথা থেকে এল, কেন এল সেই প্রশ্নও কি আপনার মাথায় আসে? আমি বা আপনি হয়তো এই নিয়ে ভাবিনি। কিন্তু লীনা ভেবেছেন। শহরের ছবি লেন্সবন্দি করতে গিয়ে এগুলো তাঁকে ভাবিয়েছে। আর সেই ভাবনা থেকেই গত দশ বছরে একটু একটু করে গড়ে উঠেছে তাঁর M.I.S.S.I.N.G Public Art প্রকল্প। নারী পাচার রুখতে যা লীনার একমাত্র হাতিয়ার।

image


এই প্রকল্প আসলে শহুরে স্কাইলাইনের ধারে রাখা ধারাবাহিক লার্জার-দ্যান-লাইফ সিল্যুয়েট। লোহার শিট দিয়ে তৈরী মিশমিশে কালো রঙ করা এই কাটআউটগুলি দেখে মনে হবে তারা আকাশে সৃষ্টি হওয়া কোনও কালেো গর্ত। এর মধ্য দিয়ে লীনা বোঝাতে চেয়েছেন সেইসব লক্ষ লক্ষ মেয়েদের কথা, যারা পৃথিবী থেকে চিরকালের মতো এক অজানা অন্ধকারে হারিয়ে যায়। ২০১৩ সালে একটি বেসরকারি সংস্থা এই প্রকল্পের পাশে দাঁড়ালেও পরে সেই কাজ আর এগোয়নি। ২০১৪সালে India Art Fair থেকে নতুন করে পথচলা শুরু করেছে লীনা কেজরিওয়ালের এই প্রজেক্ট। এবার আর আলাদা করে শুধুমাত্র কোনও সংস্থার উপর নির্ভর না করে সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেটকেও কাজে লাগিয়েছেন লীনা। চলতি মাসের শেষে হবে এই প্রকল্পের প্রথম প্রদর্শনী। তবে তার আগেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এই উদ্যোগ। ফেসবুক, ট্যুইটার, ইন্স্টাগ্রামের পাশাপাশি উইশবেরি থেকে বিশেষভাবে সাধারণ মানুষের সহযোগীতা এবং পুঁজি জোগাড় করতে পেরেছেন লীনা কেজরিওয়াল। এই প্রজেক্টের অ্যাপ তৈরীর কাজও চলছে। যেকোনও স্মার্টফোন ব্যবহারকারী সেই অ্যাপের সাহায্যে এই সংক্রান্ত বিভিন্ন সত্যি ঘটনার কথা জানা যাবে। মহিলাদের সাহায্যার্থে এবং নারীপাচার রুখতে যেসব স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কাজ করছে তাদের সন্ধানও দেবে এই অ্যাপ।

রক্ষণশীল পরিবারের লীনা আজ একাই সহস্র নারীর প্রতিবাদের ভাষা। আমাদের সমাজ পুরুষতান্ত্রিক। কিন্তু খুব আশ্চর্যের বিষয়, কণ্যাভ্রূণ হত্যা থেকে শুরু করে শিশুকন্যা পাচার, বিক্রি বা মহিলাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায়ে পুরুষদের মতোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বাড়ির মহিলারা। "এই মানসিকতা কেন? কেন মহিলারা নিজে যে অন্যায় সহ্য করছেন তা পরবর্তী প্রজন্মের উপরে নিজেরাই চাপিয়ে দিচ্ছেন?" সেই প্রশ্ন তুলেছেন লীনা। পুরুষরা মহিলাদের সম্মান তখনই করতে শিখবেন যখন সবার আগে একজন মহিলা তাঁর আশপাশের সব মহিলাকে সম্মান করবেন। মত তাঁর। সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিবছর শুধুমাত্র ভারত থেকেই প্রায় এক লক্ষ মহিলা পাচার হন। যাঁদের মধ্যে ১২ থেকে ৫০ হাজার শিশু রয়েছে। সরকারি মতে হিসেবটা অনেক কম হলেও একথা স্পষ্ট পশ্চিমবঙ্গ দেশের নারী পাচারের অন্যতম কেন্দ্রস্থল। শুধুমাত্র নারীপাচার এবং তাদের পতিতালয়ে পাঠানো নয়, আরও একটি বিষয় ভাবাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের। তা হল বাড়তে থাকা পর্নোগ্রাফি। যা আজ একটা ইন্ডাস্ট্রি। এমন এক যায়গা যেখান থেকে অনেক মেয়েই বেরিয়ে আসার সাহস পান না। লীনার বার্তা, "পর্নোগ্রাফি দেখার আগে ভাবুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, যা দেখছেন তা আসলে কী? কেন এভাবে লক্ষ লক্ষ মহিলা অত্যাচারিত হবেন এবং তা সমাজের কিছু মানুষ উপভোগ করবেন?"

আগামী ২৫নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে M.I.S.S.I.N.G Public Art Project-এর প্রথম অধ্যায়। তার আগে ইওর স্টোরির মাধ্যমে লীনার বার্তা, "আপনারা এগিয়ে আসুন। এই নিয়ে শুধু আলোচনা না করে, আপনার যা করণীয় তা করে দেখান। যদি একজন মহিলার জীবনেও আপনি পরিবর্তন ঘটাতে পারেন তা করুন। যদি অন্যের জন্য কিছু করার ইচ্ছে না থাকে, তাহলে নিজের এবং নিজের পরবর্তী প্রজন্মের কথা মাথায় রেখে করুন। তাঁদেরকে একটা সুন্দর সমাজ উপহার দিন। মনে রাখবেন বিন্দুতেই সিন্ধু গড়ে ওঠে। আমরা প্রত্যেকে এগিয়ে এলে তবেই সমাজের পরিবর্তন সম্ভব।"

লীনার এই অভিনব উদ্যোগের পাশে রয়েছে ইওর স্টোরি। লীনার মতো আমরাও বলব যেভাবে সম্ভব 'Do your bit'।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags