সংস্করণ
Bangla

দিনাজপুরের মুখা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে শিল্পীদের সমবায়

15th Oct 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

মহিষবাথান, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার এক শান্ত সবুজ গ্রাম। গ্রাম বলতেই যে দিগন্ত বিস্তৃত ক্ষেত, নীল আকাশ, আকা বাঁকা নদী, নিকানো উঠোনের কথা মনে পড়ে, ঠিক তেমনই একটি গ্রাম মহিষবাথান।


image


মহিষবাথান ও তৎসংলগ্ন এক বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের প্রাচীন লোকশিল্প গোমিরা নাচ বা মুখা খেল। গ্রামীণ দেবী গ্রাম চন্ডীর আরাধনায় স্থানীয় রাজবংশী জনগোষ্ঠীর মানুষ মুখোশ পরে এই নাচ করেন। রঙে, ভাস্কর্যে, শৈল্পিক গুণে আফ্রিকার প্রাচীন মুখোশকে মনে করায় কাঠের তৈরি এই মুখোশ, স্থানীয় নাম মুখা। তবে অন্যান্য অনেক প্রাচীন শিল্পের মতোই হারিয়ে যেতে বসেছিল মুখাও। নাচের জন্য পেপার ম্যাশেতে তৈরি মুখোশে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলেন স্থানীয় শিল্পীরা, আর শুধু মাত্র দুই দিনাজপুরে আবদ্ধ থাকায় সুযোগ ছিল না বিকাশেরও। উত্সাহ হারাচ্ছিল নতুন প্রজন্ম।

“এটি আমাদের অতি প্রাচীন একটি লোকশিল্প। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি বৈশাখ-জৈষ্ঠ মাসে গ্রামে গ্রামে বসত মুখা খেলের আসর। নানা ভগবানের মুখোশ পরে নাচ করতেন শিল্পীরা, ভর হত, কিন্তু এই চল কমে আসছিল, আর কাঠের মুখোশের ব্যবহার তো একেবারেই কমে যাচ্ছিল”, বললেন পার্শ্ববর্তী কুশমন্ডি গ্রামের বাসিন্দা পরেশ চন্দ্র সরকার।


image


পরেশবাবু পেশায় লাইব্রেরিয়ান, চাকরি করেন গ্রামেরই একটি লাইব্রেরিতে। নিজেদের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে তুলে দুনিয়ার দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন পরেশবাবু। নিজে সরাসরি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত না হলেও, এলাকার প্রাচীন এই শিল্পকে রক্ষা করা কর্তব্য বলেই মনে করেন তিনি। সেই উদ্দেশ্যেই ১৯৯০ সালে স্থানীয় বয়োঃজেষ্ঠ শিল্পীদের নিয়ে তৈরি করেন মহিষবাথান গ্রামীণ হস্তশিল্প সমবায় সমিতি।

প্রাচীন এই শিল্পকে বাঁচানোর পাশাপাশি আরও একটি উদ্দেশ্যও ছিল, এলাকার মানুষের বিকল্প কাজের সংস্থান। “আমাদের তো টাকা পয়সা নেই, আর এখন টাকা পয়সা ছাড়া কিছুই হয় না, তাই এলাকার মানুষ যাতে হাতের কাজ শিখে খেয়ে পরে থাকতে পারে সেটাও ছিল একটা লক্ষ্য”, জানালেন পরেশবাবু।

মহিষবাথান অবস্থিত দুই দিনাজপুরের সীমান্তে। এলাকার মানুষের মূল জীবিকা কৃষি। তবে পরিবার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কমেছে মাথাপিছু জমির পরিমান, এদিকে অন্য কোনও জীবিকার তেমন সুযোগ নেই। তাই জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছিলেন অনেকেই। এই সমস্যা সমাধানে অনেকাংশেই সক্ষম হয়েছে মহিষবাথান গ্রামীণ হস্তশিল্প সমবায় সমিতি।


image


বয়োঃজেষ্ঠ শিল্পীরা নবীনদের কাজ শেখান, প্রথমে পালিশ বা ছোট খাটো খোদাইয়ের কাজ দেওয়া হয়, দক্ষতা বৃদ্ধির পর পুরো একটি মুখোশ তৈরির দায়িত্ব পান শিল্পী। কাঠ ও অন্যান্য কাঁচামাল সমিতির তরফ থেকেই সরবরাহ করা হয়। শিল্পীরা সমিতিতে এসে কাজ করেন, বিক্রির ব্যবস্থাও করে সমিতিই। কাঠ ছাড়াও তৈরি হয় বাঁশের মুখোশ।

“এ তো আমাদের বাপঠাকুর্দার শিল্প, ও আমাদের ভেতরেই আছে, ছোটবেলা থেকে দেখে বড় হয়েছি, এখনকার ছেলেপুলে যারা আসে তারাও ছোট থেকেই মুখা খেল দেখে, আমি শুধু ওদের বানানোর কায়দাটা দেখিয়ে দিই, মাপজোকের ব্যাপারটা শিখিয়ে দিই, বাকি ওরা নিজেরাই বুঝে যায়”, বললেন সমিতির বয়োঃজেষ্ঠ শিল্পী ও গুরু শঙ্কর সরকার। শঙ্কর বাবু ও তার দুই ছেলে টুলু ও নন্দী তিনজনই যুক্ত মুখোশ তৈরির কাজে।


শঙ্কর সরকার

শঙ্কর সরকার


সমিতির বর্তমান সদস্য সংখ্যা ২০৫। প্রথম দিকে খুবই সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে, জানালেন পরেশবাবু, “আমাদের পুঁজি বলতে প্রায় কিছুই ছিল না, ছিল শুধু দক্ষতা। এদিকে কাঠ কিনতে খরচ অনেক। প্রথম দিকে তাই বেশিরভাগ বাঁশের মুখোশ বানানো হত, এদিকে বাঁশের মুখোশে বৈচিত্র্য কম আর আমাদের ঐতিহ্য তো কাঠের তৈরি মুখোশ। কলকাতায় অবশ্য অল্প অল্প পরিচিতি পাচ্ছিল আমাদের এই শিল্প। প্রচুর ছোটাছুটি করতে হয়েছে, তারপর আস্তে আস্তে নানা সরকারি ও বেসরকারি সাহায্য আসতে শুরু করে। সরকারি ট্রেনিংও হয় বেশ কয়েকটা”, জানালেন পরেশ চন্দ্র সরকার।

সম্প্রতি সমিতির অন্যতম সদস্য শঙ্কর দাস প্যারিসের এক প্রদর্শনীতে ঘুরে এলেন নিজেদের শিল্প সামগ্রী নিয়ে, সাড়া মিলেছে ভালই। এছাড়াও কলকাতা, দিল্লি, গোয়া, বেঙ্গালুরু, মুম্বইতে নিয়মিত মুখোশ সরবরাহ করে সমিতি।

বর্তমানে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি এবং বস্ত্র শিল্প দপ্তর ও ইনেস্কোর সহযোগিতায় স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে এখানে গড়ে উঠছে সবরকমের সুযোগসুবিধাযুক্ত গ্রামীণ হস্তশিল্প কেন্দ্র।

“মূলধন এখনও আমাদের বড় সমস্যা, তবে ইনেস্কো ও সরকারের এই প্রকল্পে কিছু সুবিধা পাচ্ছি, শিল্পীরা কাজের জন্য পুঁজি পাচ্ছেন, ঋণ পাওয়া যাচ্ছে, সমিতির বাড়িটিও পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে”, জানালেন পরেশবাবু। কাঠের মুখোশ ছাড়াও আঞ্চলিক ধোকরা শিল্পেরও ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে সমিতি। এলাকার গ্রামীণ মহিলারা ঘরে হস্তচালিত লুমে এই ধোকরা বোনেন, প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বোনা হয় ধোকরা।

এলাকাটিকে সাংস্কৃতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলা হচ্ছে। সমিতি বা শিল্পীদের বাড়িতে থেকে আঞ্চলিক সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হতে পারবেন পর্যটকরা, শিল্পোত্সাহীরা শিখতে পারেন হাতের কাজও। শীতকালে বসে গ্রামীণ মেলা। গ্রামটি পরিণত হয় এক গ্যালারিতে, শিল্পীরা সাজিয়ে বসেন তাঁদের পসরা। থাকে খন গান সহ অন্যান্য লোকসঙ্গীতের আসরও।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags