সংস্করণ
Bangla

অচিন পেশায় এক বাঙালি কন্যার লড়াই

tiasa biswas
7th Oct 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

আর্কিটেকচারাল জার্নালিজম বা স্থাপত্য সাংবাদিকতা হতে পারে বেশ ভালো একটা ক্ষেত্র। কিন্তু নিয়মিত পাঠক সেভাবে পাওয়া যায় না। তাই স্থাপত্য সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতেও দেখা যায় না তেমনভাবে। ব্যতিক্রম শুধু অপূর্বা বোস দত্ত। বেঙ্গালুরুর এক স্থপতি। গত এক যুগ ধরে মন প্রাণ ঢেলে এই কাজটাই করে চলেছেন অপূর্বা। ভারতজুড়ে বিষয়টির পরিচিতি গড়ে তুলতে চেষ্টা চরিত্রের কোনও ত্রুটি রাখছেন না এই বাঙালি কন্যা।

image


বাঙালি হলেও জন্ম, বড় হওয়া সবই চণ্ডীগড়ে। ২০০৫ সালে চণ্ডীগড় কলেজ অব আর্কিটেচার থেকে বি-আর্ক পাঠ শেষ করেন। তারপরই স্থাপত্য সাংবাদিকতায় ঢুকে পড়া। নামী স্থাপত্য ম্যাগাজিন আর্কিটেকচার প্লাস ডিজাইনে কাজ শুরু করেন। ব্রিটেন থেকে ফ্রিল্যান্স জার্নালিজমে একটা ডিপ্লোমাও রয়েছে অপূর্বার। সারা বছর ধরে বিভিন্ন জায়গায় লেকচার, লেখালেখি, ছাত্রছাত্রীদের নানা উপদেশ দিয়ে স্থাপত্য সাংবাদিকতার প্রচার করে চলেছেন। কথা বললাম অপূর্বার সঙ্গে। জানতে চাইলাম স্থাপত্য সাংবাদিকতা নিয়ে তাঁর উৎসাহের কারণ।

বি-আর্কের ফাইনাল ইয়ারে স্থাপত্য সাংবাদিকতাকে বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়ার সুযোগ আসে। মনের মধ্যে বারবার খোঁচাতে থাকে। তবে শেষ পর্যন্ত সেটিকেই বেছে নিলেন অপূর্বা। ‘তখনই ঠিক করে ফেলি এটাই আমার পথ। বিষয়টির জন্য আমি যে আবেগ অনুভব করছিলাম তুলনামূলকভাবে অন্য বিষয়গুলির জন্য সেভাবে নয়। যেহেতু এই ক্ষেত্রটি নিয়ে উদাসীনতা রয়েছে তাই হাতের পাঁচ হিসেবে রেস্টোরেশন এবং ইন্টরিয়র ডিজাইনকে বিকল্প হিসেবে বেছে রেখেছিলাম। কারণ, আমি জানতাম স্থাপত্য সাংবাদিকতায় খুব বেশি সুযোগ নেই’, বলেন অপূর্বা।

একটা সময় স্থপতিরা লিখছিলেন, কিন্তু সেই সময় স্থাপত্য সাংবাদিকতা বলে কিছু ছিল না। ফলে তাঁর পড়ার বিষয়, পেশা এইসব মানুষকে বোঝাতে কালঘাম ছুটে যেত। ‘যারা আর্কিটেক্ট তাঁরা অবশ্য জেনে খুশি হতেন, এত ভালো একটা বিষয়, বাইরে তার এত কদর। যদিও ভারতে এই বিষয়ে সুযোগ একেবারে শূন্য বলাই ভালো। তবে হ্যা, যারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদের কাছে আমি করি সেটা বোঝানো ভালই মুশকিল’, নিজের অবস্থা বোঝানোর চেষ্টা করেন অপূর্বা। অপূর্বা নিজের মনের কথা শুনলেন, ভাগ্যও সঙ্গ দিল। সুযোগ হল এ প্লাস ডি ম্যাগাজিনে। কাজ শুরু করলেন সেখানে। ‘আমাকের স্বীকার করতেই হবে, এই ম্যাগাজিনের মতো শক্ত ভিত যদি না পেতাম এই বিষয় নিয়ে বেশি দূর এগোনর সাহসই পেতাম না’, মেনে নেন অপূর্বা। বিষয়টা নতুন। তবে একবার জনপ্রিয়তা পেয়ে গেলে সারা বিশ্বে নাম ডাকের অভাব হবে না।

অপূর্বার বাবা-মা দুজনেই উচ্চশিক্ষিত। সন্তানদের পড়াশোনায় কোনও কার্পন্য করেননি। বাবা সার্জেন, মা পদার্থবিদ্যায় পিএইচডি। সন্তানদের নিয়ে আরও বড় স্বপ্ন দেখেন তাঁরা। ‘মেয়েদের সব ক্ষেত্রে অলরাউন্ডার বানাতে চেয়েছেন। আমার বাবা-মা নিজেরাও তাই ছিলেন, আছেন। আমি এবং আমার বোনেরাও যাতে আমাদের আবেগ আর শখ নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি সেটাও নিশ্চিত করেছেন’, বলেন আপ্লুত অপূর্বা।

চণ্ডীগড়ের কার্মেল কনভেন্ট স্কুল অপূর্বা আরেকটা পরিবারের মতোই। তিনি বলেন, তাঁর ব্যক্তিত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে চণ্ডীগড়ের ওই স্কুল। ‘একটা পরিবার থেকে আরেকটা পরিবারে গিয়েছিলাম আমি। শিক্ষক শিক্ষিকারা আমাদের একই সঙ্গে পশ্রয় দিতেন, উৎসাহ দিতেন এবং আমাদের তৈরি করে দিতেন। তাঁদের অনেকের সঙ্গে এখনও আমার যোগাযোগ আছে’, চোখে ঝিলিক দিয়ে যায় অপূর্বার। বিয়ের পর ব্রিটেন চলে যান। পরে আবার বেঙ্গালুরু চলে আসেন। সেখানেই পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করেন দেশ বিদেশের নানা পত্রপত্রিকায়।

বাবার পেশা তাঁকে সবসময় টানত। ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন। ‘বাবাকে যা তোষামোদ পেতে দেখতাম, মনে মনে আমিও ডাক্তারই হতে চাইতাম’। দশম শ্রেণির পর যখন বিষয় বাছতে হত, তখন বাবা একদিন মেয়েকে ডেকে সামনে বসালেন। মেডিসিনের দিকে অপূর্বার ইচ্ছেতে কোথায় তাঁর আপত্তি বুঝিয়ে বলেলন। ‘বাবা জানতেন চিকিৎসকদের কী কঠিন জীবন। আর শুধু এমবিবিএস করেই ডাক্তার হিসেবে খুব বেশি দূর এগোন যায় না। মেডিক্যালের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলাম। বেছে নিলাম স্থাপত্যকে’, সেই দিনের কথা মনে করেন অপূর্বা।

লেখাটেখা অপূর্বার সহজাত। ছোটবেলায় খুব লিখতেন। কিন্তু তখন ছিল শখ। সেই শখই এখন অপূর্বার পেশা। স্থাপত্য সাংবাদিক হিসেবে অপূর্বার মুকুটে এখন অনেক পালক।বহু পুরস্কারও পেয়েছেন কাজের অবদান হিসেবে।

image


অপূর্বার মতে এই ক্ষেত্রটিরও বিস্তার হচ্ছে। গতকয়েক বছরে সেটা অনেকটা গতি পেয়েছে। প্রায় শ খনেক পড়ুয়াদের কাছ থেকে এই বিষয়ে তালিম নেওয়ার কথাও শুনেছেন তিনি। ‘ভারতের প্রায় ১১-১২টি আর্কিটেকচারাল কলেজে ইলেক্টিভ সাবজেক্ট হিসেবে রয়েছে স্থাপত্য সাংবাদিকতা। তবে এটা ঠিক, পাঠ্যক্রমে গুরুত্ব দিতে হলে ফ্যাকাল্টি আনতে হবে যারা বিষয়টা জানেন,পড়াতে পারবেন। কারন শুধু পোশাকি বিষয় হয়ে থাকার কোনও মানে হয় না’,মত অপূর্বার। ক্রমাগত এই বিষয়ে লেখালেখি করে, বিভিন্ন জায়গায় ভাষণ দিয়ে, কথা বলে, বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার করে অপূর্বা তাঁর লক্ষ্যের দিকে ধীরে অথচ স্থিতিশীলভাবে এগোচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এই বিষয়টির গভীরতা আছে। যারা বুঝতে পারেন তাঁরাই একমাত্র পড়াতে পারেন। আমি ভারতের কাউন্সিল অব আর্কটেকচার এবং আর্কিটেক্ট সংগঠনের নানা কর্তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি। তাঁদের কথা বার্তায় উৎসাহ নজরে এসেছে। আরও অনেক ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছেন তাঁরাও। মেইনস্ট্রিম সাবজেক্ট হিসেবে স্থাপত্য সাংবাদিকতাকে নেওয়ার একটা জোরালো পদক্ষেপ জরুরি’।

তিনি বলেন, ‘খুব কম পরিচিতি আছে এমন বিষয় কেউ বাছলে তাকে বিষয়টি সম্পর্কে খুব বেশি আবেগপ্রবণ হতে হবে। সুযোগ এলেই তার সদব্যবহার করতে হবে। তা ছাড়াও ভালো লিখতে বলতে জানতে হবে, নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, স্থাপত্য বিশ্বে অল্প বিস্তর জায়গা ধরতে হবে। কীভাবে স্থাপত্যকে পেশ করা যায় ভাবতে হবে, প্রচুর পড়াশোনা এবং চারপাশে কী ঘটছে নজর থাকতে হবে। সবচেয়ে জরুরি নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকা। যদি পেশাদার হতে না পার, তাহলে সাফল্যের কথা ছেড়ে দাও’।

অপূর্বার মতে, গত কয়েক বছরে দেশে স্থাপত্য, অন্দরসজ্জা এবং নির্মান ক্ষেত্রে ম্যাগাজিনের সংখ্যা বেড়েছে। যেহেতু ডিজিটাল মিডয়ার একটা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে এবং খুব দ্রুত বিরাট অংশের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, তারপরও অপূর্বার মতে, প্রিন্ট মিডিয়া যেভাবে যোগাযোগ তৈরি করে, ডিজিটাল মিডিয়া সেভাবে পারে না। ‘ডিজিটাল মিডিয়াতেও পড়ার অনেক কিছু রয়েছে। কিন্তু আমার মতে এখনও একটা বই অথবা হার্ড কপি ঢের ভালো’।

পেশা আর্কিটেকচারাল জার্নালিজম বা স্থাপত্য সাংবাদিকতা ঘিরে তাঁর আবেগের জন্য চারদিক থেকে প্রচুর উৎসাহ পেয়েছেন, যা তাঁকে সামনে চলার পাথেয় যুগিয়েছে। ‘সমস্ত পুরস্কার, সম্মান আমাকে আনন্দ দেয়, আরও দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে এই পেশায় এগিয়ে যাওয়ার প্ররণা যোগায়। কিন্তু মনে হয় সবচেয়ে প্রিয়জনদের কাছ থেকে যে প্রশংসা আমি পেয়েছি সেটাই আমার প্রাণের সবচেয়ে কাছে থাকবে’, শেষ করেন অপূর্বা।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags