সংস্করণ
Bangla

অদম্য উৎসাহের আর এক নাম জারিনা স্ক্রুওয়ালা

Tanmay Mukherjee
26th Aug 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
জারিনা স্ক্রুওয়ালা

জারিনা স্ক্রুওয়ালা


একটা সময় ছিল, যখন দেশের শিল্পোদ্যোগে ঝুঁকি নিতেন না মহিলারা। ভারতের উদ্যোগপতিদের আঙিনায় কেবল ঘোরফেরা করত পুরুষদের নাম। কিন্তু গতে বাঁধা এই চিন্তাধারায় পরিবর্তন আনলেন এক মহিলা। তাঁর সর্বাঙ্গীন চেষ্টায় ১৯৯০ সালে দেশের মাটিতে যাত্রা শুরু করল ইউ টিভি। খুব বেশি দিন লাগল না। অঙ্কুর হতে মাত্র দু’দশকের মধ্যেই মহীখরূহে পরিণত হল ইউ টিভি। এক মহিলার ব্যবস্থাপনা শক্তির বলে উর্ধমুখী হল কোম্পানির উন্নয়নসূচক। এক সময় কোম্পানির সমৃদ্ধির দিকে নজর পড়ল আন্তর্জাতিক উদ্যোগপতিদের। দ্রুত ‘দ্য ওয়াল্ট ডিজনি’-র মতো কোম্পানি ইউ টিভি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দিল। শেষে ৪৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে ইউ টিভির মালিকানা স্বত্ব কিনল ডিজনি। প্রমাণিত হল বাস্তববোধ ও প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়ার ক্ষমতা থাকলে মহিলারাও উদ্যোগপতি হতে পারেন। যাঁর দূরদর্শিতার ফলে এই অসাধ্যসাধন সম্ভব হয়, অদম্য উসাৎহী সেই মহিলার নাম জারিনা স্ক্রুওয়ালা।

ছেলেবেলেটা মুম্বইতেই কেটেছিল জারিনার। মুম্বইয়ের জেবি পেটিট গার্লস স্কুলের গণ্ডী পেরিয়েই জীবনের পথ চলা শুরু। জারিনা জানান, তাঁর সাফল্যের ইমারতের ভিত গাঁথা হয়েছিল স্কুল জীবনে। এক সময় স্কুলের প্রিন্সিপলের সান্নিধ্যে আসেন তিনি। প্রিন্সিপলই তাঁর পরবর্তী জীবনে লড়াইয়ের শক্তি জোগানোর অন্যতম কারিগর। ষাটের দশকের এক মহিলার প্রগতিশীল চিন্তাধারা স্তম্ভিত করে দেয় জারিনাকে। তখনকার সমাজে দাঁড়িয়েও ওই মহিলা ছাত্রীদের ‘যা খুশি তাই’ করার পরামর্শ দিতেন। বলতেন ঘরকুনো হয়ে বসে লাভ নেই। যা ইচ্ছে তা না করতে পারলে জগতের ভাল-মন্দ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান জন্মায় না। প্রিন্সিপলের এই বিদ্যে আজও ভোলেননি জারিনা। জেবি পেটিট স্কুলের প্রিন্সিপলের মতো তিনি বিশ্বাস করেন, পুঁথিগত বিদ্যাই শেষ কথা নয়। প্রতি মুহূর্তের ঘটনাবলী সম্পর্কে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে। কৌতূহলী মনই একমাত্র তাঁকে জীবনের উত্তর দিতে পারে। এই চিন্তাধারাই এখন ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর বর্তমান সংস্থা ‘স্বদেশ’ ফাউন্ডেশনের মধ্যেও।

ছোট থেকেই মিতভাষী, লাজুক বলেই পরিচিত ছিলেন জারিনা। অনেক সময় মনের কথা যথা সময়ে মুখে আনতে পারেননি। যার ফল ভুগতে হয়েছে বহুবার। কিন্তু পরবর্তী জীবনে এই লাজুক মেয়েটিই হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা। যার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব পার্ল পদমসিকেই দেন জারিনা। বহু জায়গায় প্রকাশ্যেই পার্লকে গুরু বলে অভিহিত করেন তিনি। জানা যায়, পার্লের প্রযোজিত একটি নাটকে প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে জীবন শুরু করেন জারিনা। পার্লের মতো নাট্যব্যক্তিত্বের কাছে হাতেখড়ি হওয়ায়, তাঁর ভাবপ্রকাশের জড়তা সহজেই কেটে যায়। দ্রুত আড়ষ্টভাব কাটিয়ে এক দৃঢ়প্রত্যয়ী মহিলা হয়ে ওঠেন প্রাক্তন ইউ টিভির মালকিন। পরবর্তীকালে তাঁর এই ব্যক্তিত্বের জেরেই নেতিবাচক আলোচনাকেও তিনি ইতিবাচকে মোড় দিতেন।

নাটক দিয়ে শুরু হলেও এর পরের ধাপটা ছিল টেলিভিশন। তবে এবার আর প্রোডাকশন ম্যানেজার নয়, সরাসরি সহযোগী পরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার ডাক এল জারিনের কাছে। এক বন্ধু তাঁকে ‘মশহুর মহল’ নামে একটি প্রযোজনায় সহকারী হওয়ার জন্য বলেন। সেই সময় দূরদর্শনের তত্ত্বাবধানেই সব ধরনের প্রযোজনা রূপ পেত। ‘মশহুর মহল’ ছিল ভারতীয় টেলিভিশনের ইতিহাসে প্রথম বেসরকারি প্রযোজনা। প্রথম দিনেই টেলিভিশন প্রযোজনার কর্মকাণ্ড ‌দেখে অবাক হয়ে যান জারিনা। ক্রমে সেটে সহকারী পরিচালক হয়েও কারিগরির খুঁটিনাটি বুঝে নেন তিনি। এরপর থেকেই উদ্যোগপতি হওয়ার পোকাটা মাথাচাড়া দেয় তাঁকে। পরিচিতরা যখন ভোগ্যপণ্যকে ব্যবসা হিসাবে বেছে নেয়, তখন টেলিভিশনকেই শিল্পোদ্যোগের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন জারিনা। পরবর্তীকালে তাঁর সেই চিন্তাধারার ফসল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ইউ টিভি।

তবে এত বড় শিল্প্যোদোগের মালকিন হয়েও মনের খুঁতখুতানিটা থেকেই যায় জারিনার। একসময় টিভি প্রযোজনার কাজে তাঁকে ঘুরতে হয়েছে গ্রামাঞ্চলে। সেখানে গ্রামের গরিব মানুষের জীবনযাপন দেখে আঁতকে উঠেছিলেন তিনি। তাই ইউ টি‌ভির ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠলেও নতুন করে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন তিনি। ভাগ্যও তাঁর সঙ্গ দেয়। ওয়াল্ট ডিজনির ইউ টিভি কেনার প্রস্তাব দিতেই তিনি রাজি হয়ে যান। ২০১১ সালে ইউ টিভি ছাড়তেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘স্বদেশি ফাউন্ডেশন’। যার মূল লক্ষ্য, প্রতি পাঁচ বছরে দেশের ১০ লক্ষ মানুষকে ‘গরিবি’ আওতার বাইরে আনা। প্রশ্ন জাগে, এও কী করে সম্ভব? যেখানে সরকার গরিবের উন্নয়ে কাজ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে‌, সেখানে একটা সংগঠনের পক্ষে এই বিশাল কর্মকাণ্ডকে বাস্তবে রূপ দেওয়া কি আদৌ সম্ভব? কিন্তু ভাল করে খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে ইতিমধ্যেই ১০৮ জনের একটা দল তৈরি করেছেন প্রাক্তন ইউ টিভির রূপকার। ঘরে বসে নেতাদের মতো বক্তৃতা দেন না। এরা সরাসরি মাঠে-ঘাটে গিয়ে গরিবের উন্নয়নে কাজ করেন। জারিনার লক্ষ্যকে সামনে রেখে মূলত গরিব মানুষদের প্রাথমিক চাহিদাগুলো পূরণ করার চেষ্টা করছে স্বদেশি ফাউন্ডেশনের কর্মীরা। যেখানে গ্রামের দরিদ্রদের কৃষিকাজের কম শ্রম দিয়ে অধিক ফলনের টোটকা দেওয়া হয়। তাদের জন্য চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়া হয়।

যদিও গ্রামের গরিব-গুর্বো মানুষদের এই প্রাথমিক চাহিদা পূরমণ করেই থামতে চান না জারিনা। পরবর্তীকালে এই নিয়ে আরও কাজ করতে চান তিনি। সে কারণে স্বদেশি ফাউন্ডেশনের কর্মী বাছাই পর্বে নিজে হাজির থাকেন। দেখেন ভুল করেও যেন সংস্থায় নেতিবাচক চিন্তাধারার ব্যক্তিরা সুযোগ না পান। তাঁর মতে ‘‘বায়োডটায় বড় বড় ডিগ্রি দেখে কর্মী নিয়োগ করি না। তাই সাক্ষাৎকারে প্রথমে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কর্মপ্রার্থীর লডা়ইয়ে ক্ষমতা যাচাই করে দেখি। এরপরই কোনও সিদ্ধান্তে আসি।’’

এক সময় রনি স্ক্রুওয়ালার ইউ টিভি শুরু করেন জারিনা। প্রথমে এক মহিলার উদ্যোগপতি হওয়াকে ভাল চোখে দেখেননি তাঁর পরিচিতরাই। অনেকেই ভেবেছিলেন, কিছুদিনের মধ্যেই ব্যবসা লাটে উঠবে। ফের অন্য কিছু ভাববেন জারিনা। কিন্তু এক্ষেমত্রে ঠিক উল্টোটা ঘটল। ইউ টিভির ছাতার তলায় একে একে হাঙ্গামা টিভি, ইউ টিভি বিন্দাস চ্যানেল শুরু হয়। ২০০৪ সালে শিশুদের জন্য হাঙ্গামা টিভি আনেন জারিনা। মাত্র দু বছরের মধ্যেই ভারতীয় টেলিভিশনে এক নম্বর শিশুদের চ্যানেলের শিরোপা পায় হাঙ্গামা টিভি। টিআরপিতে সবাইকে পিছনে ফেল দেয়ে ওই চ্যানেল। পরে নতুন চিন্তাধারার ‘বিন্দাস টিভি’-ও টেলিভিশন দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়। একদা মহিলা উদ্যোগপতি বলে যারা জারিনাকে আড়ালে কটূক্তি করেছিলেন, পরে তাঁরাই জারিনার গুণগ্রাহী হন। তাই নতুন মহিলা উদ্যোগপতিদের জন্য জারিনার বার্তা, ‘‘ব্যবসায় নামার আগে নিজের লক্ষ্যটা ঠিক কর। ব্যবসা শুরুর পর প্রাথমিকভাবে অনেক বিপত্ত আসবে। কিন্তু হাল না ছেড়ে বুদ্ধিমত্তার স‌ঙ্গে লড়াই কর। দেখবে আপনা থেকেই পথ মসৃণ হয়ে গেছে।’’

পরিসংখ্যান বলছে, দেশে এখন মহিলা উদ্যোগপতিদের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়। এক সময় জারিনা স্ক্রুওয়ালা যে পথ দেখিয়েছেন, সেই পথে নেমে পড়েছেন অনেকে। কেউ কেউ হোঁচট খেলেও সাফল্যের পথ দেখেছেন বহু। তাঁদের কাছে ইউ টিভির প্রাক্তন মালকিন এক লড়াইয়ের প্রতীক। অদম্য উসাৎহের অপর নাম জারিনা স্ক্রুওয়ালা।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags