সংস্করণ
Bangla

যুদ্ধ না, বলছেন বার্লিনের বারটল্ফ

উরির ঘটনা জানাজানি হতেই আসমুদ্র হিমাচল গর্জে উঠেছে প্রতিশোধের দাবিতে। বিশ্বও ফুঁসছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরও জোরালো হচ্ছে আন্তর্জাতিক লবি। পাকিস্তান বলছে এসব আসলে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা থেকে চোখ সরানোর ফিকির। একে অপরের দিকে কাদা ছুড়ছে। ক্রমান্বয়ে উপমহাদেশের কূটনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হয়ে পড়ছে। এসব ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে আমরা যখন চলেছি একটা অন্ধকার অনিশ্চিত টানেলের ভিতর। একটা কূট এবং তিক্ত অজানা সময় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে তখনও ২১ সেপ্টেম্বর, বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস।

21st Sep 2016
Add to
Shares
11
Comments
Share This
Add to
Shares
11
Comments
Share

সীমান্তে যখন রক্ত ঝরছিল। বারুদের গন্ধ মাখা, ভারতীয় জওয়ানদের লাশ পেরিয়ে জঙ্গিদের বুলেটগুলো ছুটে আসছিল, গ্রেনেডের শ্লাঘা গর্জন করছিল, প্রত্যাঘাতের প্রত্যুত্তরের সেই আগুন ঝরা সময়েও বিহার রেজিমেন্টের সাহসী জওয়ানদের চোখের সামনে স্নিগ্ধ বুদ্ধের স্থবির রূপ ভেসে উঠেই মিলিয়ে গিয়েছে। তখন ওঁরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় অর্জুনের মত সারথি কৃষ্ণের ইশারায় তুলে নিয়েছেন স্টেনগান। রণং দেহি।শান্তি যেন আগেই পরাস্ত হয়ে গিয়েছে। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সামনে নিষ্ক্রিয়তা তখন ক্লীবতা। বীরের মত বুক চিতিয়ে ১৮জন জওয়ান চলে গেলেন বরফে। আহত হয়ে হাসপাতালেও রণরক্তে আস্ফালন করছেন আরও অনেক সীমান্ত-রক্ষী। এরই মধ্যে শান্তির দিবস ২১ সেপ্টেম্বর গোটা বিশ্বজুড়ে ধুমধাম করে পালিত হল। 

আমি এই সীমান্তে দাঁড়িয়ে আজ আপনাদের সঙ্গে এক জার্মান সমাজকর্মীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। তাঁকে অনেকেই চেনেন না। তাঁর নিজের দেশেও খুব একটা পরিচিত নাম নন। কিন্তু তিনি খুবই প্রাসঙ্গিক। বাঙালি নন। তবু বারবার রবীন্দ্রনাথ আওড়ান। রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনেন। আর গুন গুন করে গান করেন "আমি মারের সাগর পারি দেব গো... "
image


আমি মহাত্মা গান্ধির প্রতি আশৈশব আস্থাশীল। তাই আমার কমিউনিস্ট বন্ধুরা ছেলেবেলা থেকেই বিদ্রূপ করত। মহাত্মার উদ্ধৃতি তুলে তুলে আমায় বলত আমি তাঁর অহিংসার বানী নিয়ে কেন এত বিমোহিত? কেন গান্ধি প্রহারের বিরুদ্ধে শান্তির কথা বলছেন? কেন তিনি দুর্দমনীয় হয়ে গোটা দেশকে আঘাতের বিরুদ্ধে আঘাত ফিরিয়ে দিতে বলছেন না? কেন তিনি স্তিমিত করতে চাইছেন ভিতরের আগুন? একসময় মনে মনে আমারও প্রশ্ন ছিল। কখনও অম্লান দত্তের প্রবন্ধের দীপিত স্নিগ্ধতায় খুঁজতাম শান্তির সেই দূতকে। যিনি নিজের বুকে অশান্ত বুলেটকে ঠাঁই দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমরা ভাবনায় আলো দিলেন এই বিদেশি ভদ্রলোক। ক্রিস্টিয়ান বারটল্ফ। সুদূর বার্লিনে একটি সেন্টার চালান। নাম গান্ধি জেন্ট্রুম। আন্তর্জাতিক শান্তির জন্যে তৈরি করেছেন এই প্রতিষ্ঠান। ওঁর বাড়িতে যখন গিয়েছিলাম তখন দেখেছি ঘরের কোণায় মহাত্মা গান্ধির একটি ফোটো। পাশেই টলস্টয়ের। আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। অন্য দেওয়ালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মার্টিন লুথার কিং, মাঝখানে চে গেভারা তার পাশেই নেলসন ম্যান্ডেলা। একটা তেল রঙে আঁকা এটিনে ডে লা বোয়েটির ছবি। মুখোমুখি হেনরি ডেভিড থোরিও। একমাত্র মহাত্মা গান্ধির ছবিতেই সুতোর গুলি করে করে বানানো মালা ঝুলছে। তাক ভর্তি বই। সবই যুদ্ধ বিরোধী সাহিত্য। প্রবন্ধের সংকলন। অধিকাংশই মহাত্মা গান্ধিকে নিয়ে লেখা।

গান্ধিকে তিনি বীর হিসেবে দেখেন। কারণ তাঁর মতে গান্ধি যে শান্তি চেয়েছিলেন তা উপলব্ধি করতে সাহস লাগে। মারের মুখে ইস্পাতের মত দাঁড়িয়ে থাকার সাহস। প্রহারকে তাচ্ছিল্য করার স্পর্ধা। একজন বীরের পক্ষেই এই সাহস দেখানো সম্ভব। ভীতু মানুষ ঘরে ইঁদুর ঢুকলেও হাতে লাঠি নিয়ে তেড়ে যায়। আর বীরের সামনে মহাপ্লাবন এলে বুক চিতিয়ে তার জাতিকে বাঁচানোর জন্যে লড়াই করে। গান্ধির মৃত্যুকে যিশুর ক্রুশ বিদ্ধ হয়ে মহাপ্রয়াণের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছেন বারটল্ফ।

গোটা বিশ্বের বিপন্ন শান্তি এবং বিধ্বস্ত মানবতা নিয়ে উদ্বিগ্ন বারটল্ফ। ইটালি, ফ্রান্স, রাশিয়া, সিরিয়া, পশ্চিম এশিয়া, এমনকি বাংলাদেশ নিয়েও তার উদ্বেগের শেষ নেই। ঘন ঘন সেমিনার আয়োজন করেন কিভাবে গোটা বিশ্বকে সন্ত্রাস এবং হিংসামুক্ত করা যায় তাই নিয়ে বিভিন্ন দূতাবাসে ছোটেন এই মানুষটি। আলেকজান্ডার প্লাজের মুক্ত ময়দানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। গোটা দুনিয়ার পরিস্থিতি কোন দিকে এগোচ্ছে তাই নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেন। গত প্রায় তিন দশক ধরে প্রচারের আলোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে এরকম করে আসছেন তিনি। নিয়ম করে তাঁর ভাষণ শুনতে আসেন হামবোল্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক থেকে শুরু করে বার্লিনের তাবড় বুদ্ধিজীবীরা। বিভিন্ন সেমিনারে বলার সুযোগ পেলেই চলে যান এই জার্মান দার্শনিক। নিজেকে যতটা বিনয়ী রাখা যায় চেষ্টা করেন তার থেকেও বেশি বিনয়ী হতে। সামান্য সামাজিক সুরক্ষার অর্থে দিন চলে। সামান্য নিরামিষ আহার করেন। মদ্যপান করেন না। কোনও নেশা নেই। জীবনে তাঁর মূল প্রতিপাদ্য শান্তি। ব্যক্তিগত শান্তি নয়। ধ্যান নয়। ধর্মীয় কোনও বার্তা নয়। গোটা বিশ্বের শান্তিই একমাত্র তাঁর লক্ষ্য। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি যারা ভাবছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারের লোভ আছে লোকটার কিংবা ম্যাগসেসে পেতে চান তারা ভুল ভাবছেন। কারণ ইতিমধ্যেই অনেক সম্মান তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য পুরস্কার দিয়ে তাকে খরিদ করা যাবে না। কথায় কথায় শুধু গান্ধি নয় নোয়াম চমস্কি কোট করেন। ওয়াঙ্গিরা মাথাইয়ের কথা বলেন। মহম্মদ ইউনুসের কাজের কথা তুলে ধরেন। হিটলারের হিংসায় লজ্জিত জার্মানির মানুষ মাথা নিচু করে শোনে। বার্লিনের ব্রুসলার স্ট্রসেতে অ্যান্টি ক্রাইগ বা যুদ্ধ বিরোধী একটি মিউজিয়ামও চালান। সেখানে যুদ্ধের বিভীষিকার ছবি টাঙানো রয়েছে। বিভিন্ন মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা হিটলারের অত্যাচারের কিছু চিহ্ন সেখানে প্রদর্শিত হয়। প্রবেশ অবাধ। পথচলতি কৌতূহলী মানুষ যদি ঢুকে পরেন তাহলে তাঁদের যুদ্ধের কদর্য দিকটা ব্যাখ্যা করে শোনান বারটল্ফ।

গান্ধি জেন্ট্রুমের প্রতিষ্ঠাতা বারটল্ফের শান্ত ভঙ্গিমায়, সাধারণ জীবন শৈলীতে মুগ্ধ বার্লিন। কারণ বার্লিন দেখেছে কাঁটাতারের কী মহিমা। ড্রেসডেনের বোমারু বিমানের তাণ্ডব, দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা একটা আস্ত জনপদের দুঃস্বপ্ন এখনও ভুলতে পারেনি জার্মানি। গোটা ইউরোপ হারে হারে মজ্জায় মজ্জায় জানে যুদ্ধ মানে শুধু লোকক্ষয় নয়... আরও বড় ক্ষতি। যুদ্ধ মানে একের পর এক প্রজন্ম শুধু ইরেজার দিয়ে মুছে দেওয়া। তাই যুদ্ধের আগে শান্তির প্রয়োজন। শান্তির জন্যেই কূটনীতি জরুরি। আন্তর্জাতিক এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন জরুরি। একে অপরের কাছে যত অপরিচিত হয়ে থাকবে ততই ঘৃণা বাসা বাঁধবে। বাড়বে দ্বিপাক্ষিক অম্লমধুর শত্রুতা, কূটনীতির লোক দেখানো আদিখ্যেতার তখন একটাই উত্তর পড়ে থাকে সংঘর্ষ। লড়াই। শত্রু-নিকেশ। তখন শান্তি পরাজিত।

Add to
Shares
11
Comments
Share This
Add to
Shares
11
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags