সংস্করণ
Bangla

নৃত্যের মাধ্যমে দরিদ্রের মুখে হাসি ফোটান ফাদার সাজু

sananda dasgupta
2nd Oct 2015
Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share
image


দক্ষিণ ২৪ পরগণার নেপালগঞ্জের হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে মেয়ে ইমানুয়েল, সত্যেন, বন্দনা, পার্বতী, আকাঙ্ক্ষা, গ্লোরিয়া। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়ে। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াই একটা চ্যালেঞ্জ, শিল্পচর্চা? সে ভাবনাও দুঃসাহস। কিন্তু ওরা প্রত্যেকেই আজ নৃত্যশিল্পী, সামনে বছর পাড়ি দিচ্ছে জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নাচের অনুষ্ঠান করতে। গত চার-পাঁচ বছর ধরে ওদের নাচ শিখিয়েছেন ফাদার সাজু, জে-সুইট নৃত্যশিল্পী। এখন স্থানীয় শিশুদের স্কুলে নাচ শেখায় ইমানুয়েল, সত্যেন,বন্দনারা।


image


বছর ৫০ এর ফাদার সাজু জর্জের জন্ম কেরালার কোট্টায়ম জেলার শান্তিপুর গ্রামে। গত বেশ কয়েক বছর ধরে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার দরিদ্র প্রান্তিক মানুষদের জন্য কাজ করছেন ফাদার সাজু। শুধু নৃত্য শিক্ষাই নয়, এলাকার মানুষের যখনই সাহায্য প্রয়োজন হয়েছে এগিয়ে এসেছেন তিনি। দিনমজুরের কাজ করে পরিবার চালায় বিপ্লব, প্রবীর, সুরেশ, বিমলরা। দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করতেই নাভিশ্বাস ওঠে। বাড়িঘর সবই ছিল মাটির দেওয়াল, বাঁশের ছাউনি। বর্ষাকাল এলেই ধ্বসে পড়ত দেওয়াল, পচতে শুরু করত চালের বাঁশ, কিন্তু বাড়ি পাকা করার টাকা নেই। তখনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন ফাদার। তাঁদের নিজেদের টাকা ও ফাদারের অর্থ সাহায্যে প্রত্যেকেই আজ বাস করেন পাকা বাড়িতে।

স্বামী বিবেকানন্দ, মাদার টেরেসা ও রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত সাজু জর্জ কলকাতাকেই বেছে নেন কাজের জায়গা হিসেবে। “আমাদের পরিবারে সন্ত হয়ে দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করার পরম্পরা রয়েছে, কলকাতায় এসে প্রথমে মিশনারি অফ চ্যারিটির পুরুষদের বিভাগে যোগ দিই, এছাড়াও অন্যান্য হোমেও গরীব দুখীদের জন্য কাজ করেছি, একবছর পর যোগ দিই ধ্যানাশ্রমে, সেখানে তিন বছর আধ্যাত্মিকতা, ভাষা ও সংস্কৃতি শিক্ষা গ্রহণ করি,” জানালেন ফাদার সাজু।

ছোট থেকে নাচ ভালবাসতেন সাজু, নাচ শেখেন দিদি সেলাইন চার্লসের কাছে। ১৯৮৫ তে যোগ দেন সোসাইটি অফ জেসুইটস-এ, সেখানে নৃত্যশিল্পী হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা পান। ১৯৮৮ তে নৃত্য শিক্ষা শুরু করেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কুচিপুরীর অধ্যাপক নাট্যাচার্য এমসি বেদান্ত কৃষ্ণার কাছে। এরপর ১৯৯১ থেকে কলাক্ষেত্রর গুরু কে রাজকুমারের কাছে ভারতনাট্যম শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন সাজু। চেন্নাইইয়ের সত্যনিলায়ম কলেজ ও ফিলসফি অ্যান্ড কালচার থেকে দুবছরের ডিপ্লোমা পান। স্নাতকস্তরে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়েন ফাদার সাজু, এছাড়াও চেন্নাইয়ের স্যাক্রেড হার্ট কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক হন। স্নাতকোত্তর করেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতনাট্যম নিয়ে। শিক্ষা শেষে সাংস্কৃতিক কোঅরডিনেটর হিসেবে যোগ দেন কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে, পড়াতেন ভারতীয় সংস্কৃতি ও দর্শন। ২০০৮ এ জে-সুইট ফাদারদের দ্বারা পরিচালিত হোম শান্তিনীড়ে ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন ফাদার সাজু। “শান্তিনীড়ে বসবাসকারী ২০০ ছেলেমেয়ের পড়াশোনা ও অন্যান্য বিষয় উন্নতির দায়িত্ব ছিল আমার। নিজেদের প্রকাশ করার মাধ্যম হিসেবে নাচ ও নাটক শেখানো হত বাচ্চাদের। জীবনে প্রাথমিক প্রয়োজনীয় জিনিসগুলি থেকেই বঞ্চিত ছিল ওরা, শান্তিনীড়ে এসে নতুন জীবন পায় ওই কচিকাঁচার দল,” বললেন ফাদার সাজু।

এছাড়াও কলার্হদয়া ও আর্ট পিস ফাউন্ডেশনের মতো একাধিক সংস্কৃতি চর্চা ও সামাজিক উন্নয়ন কেন্দ্রের ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন তিনি। “কলার্হদয়াতে যেকোনো ইচ্ছুক ব্যক্তি বিশেষত সমাজের নীচতলায় বসবাসকারীদের নৃত্য শিক্ষা দিই। প্রত্যেকেরই বহুবিধ প্রতিভা রয়েছে, আমি মনে করি সেই প্রত্যেকটিকেই বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত,” বললেন সাজু।

ফাদার সাজুর নাচ সারা পৃথিবীর দর্শকের প্রশংসা পেয়েছে, ২৫ টি দেশে নৃত্যকলা প্রদর্শন করেছেন তিনি।


image


“নাচ থেকে আমার যা আয় সেই টাকায় দক্ষিণ ২৪ পরগণায় ছয় একর জমি কিনেছি, সেখানে শিল্প-বিষয়ক, বিশেষত প্রদর্শন শিল্প কলেজ খোলার ইচ্ছে রয়েছে, এই এলাকার মানুষ গরীব, তাই জীবনের সূক্ষ্ম দিকগুলি থেকে বঞ্চিত, আগামী দু’বছরের মধ্যে নাচ, নাটক ও অন্যান্য প্রদর্শন শিল্পের ওপর ডিপ্লোমা কোর্স ও তারপর বিএ ও এমএ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে দরিদ্র প্রান্তিক ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়তে পারবে,” জানালেন ফাদার সাজু।

সামনে বছর জার্মানি, সুইজারল্যান্ড আর অস্ট্রিয়া পাড়ি দিচ্ছে ওরা, নাচের অনুষ্ঠান করতে.

দুবেলা দুমুঠো খাবারটুকু জোটাতেই নাভিশ্বাস ওঠে পরিবারের. নাচের কথা ভাবা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়.

Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags