সংস্করণ
Bangla

নাচের ছন্দে স্বপ্ন দেখাচ্ছে 'ড্রিমার্স'

2nd Nov 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

চোদ্দ-পনেরো বছর বয়সে বলিউডে নাচ দিয়ে শুরু। অনেক চড়াই-উতরাই পার করে বছর ছাব্বিশের রাম স্যার এখন ছোট শহরের ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন দেখতে শেখাচ্ছেন। জীবনের স্ট্রাগল আর অনেক না পাওয়া তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে। নিজের কিছু করার ইচ্ছে ছিল বহুদিনের। তাই বলিউডে অ্যাসিস্ট্যান্ট কোরিওগ্রাফারের কাজ থেকে রোজগারের টাকার পুরোটাই খরচ করে দিয়েছেন ছোট শহরের ছেলেমেয়েদের ট্রেনিং দিতে। আসানসোল,পুরুলিয়া, রাঁচির মতো জায়গায় হিপ-হপ, সালসা, জ্যাজ-এর মতো ডান্স ফর্ম পৌঁছে দিয়েছে রাম স্যারের Dreamer's Dance Academy।

image


বাবা রাম বাহাদুর মণ্ডল ছিলেন বলিউডের 'মাস্টারজি', গণেশ আচারিয়ার গুরু। বাবার কাছে হাতেখড়ি হলেও ছেলে বিদেশ মণ্ডল নাচে পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বাবার এককালীন ছাত্র এখনকার 'মাস্টারজি'-র কাছেই। স্বপ্নের নগরী মুম্বই। ঝাঁ চকচকে বলিউড। কিন্তু গ্ল্যামারের দুনিয়ার পিছনের ছবিটা যে একেবারেই রঙিন নয়, তা অল্প বয়সেই উপলব্ধি করেছিলেন বিদেশ মণ্ডল ওরফে রাম স্যার। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকের কথা। সেই সময় আর যাই হোক, কোরিওগ্রাফাররা Celebrity status পেতেন না। তখনকার দিনে হিন্দি ছবিতে কোরিওগ্রাফি করে সংসার চালানো ছিল প্রায় অসম্ভব। তাই মণ্ডল পরিবারে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। বাড়ির বড় ছেলে রামকে তাই চোদ্দ বছর বয়সেই বাবা জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাড়িতে আরও এক ছেলে, এক মেয়ে এবং স্ত্রী রয়েছে। তাই ক্লাস টুয়েলভের পর তার পড়াশুনোর খরচ বাবা আর বহন করতে পারবেন না। ছেলেও তাই তখন থেকেই ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ করতে শুরু করে। পাশাপাশি পড়াশুনো আর নাচও চলছিল। বাবার সূত্রে গণেশ আচারিয়াকে চিনতেন রাম। তাঁর কাছেও নাচ শিখতে শুরু করেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর নাচ 'মাস্টারজি'-র নজর কাড়ে। হবে নাই বা কেন? তাঁর রক্তে রয়েছে নাচ।

কিন্তু শুধুমাত্র নাচে মনোনিবেশ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ছাপাখানায় নাইট শিফ্টে মেশিন চালানোর কাজ নেন। সকালে ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রির কাজ, সারারাত প্রেসের কাজ, আর দিনের বাকি সময় বরাদ্দ ছিল নাচের জন্য। বছরখানেক এভাবেই চলার পর গণেশ আচারিয়া ডান্স অ্যাকাডেমির প্রশিক্ষক নিসেবে তাঁকে নিযুক্ত করেন 'মাস্টারজি'। সঙ্গে চলতে থাকে গণেশ আচারিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ। 'আমার প্রথম ছবি ছিল Tere sang। ওই ছবিতে মাস্টারজির সহকারী হিসেবে কাজ করি। তারপর ছবি হলেই মাস্টারজি ডেকে পাঠাতেন। তবে আমার তখন মূল কাজ ছিল ওনার বিভিন্ন অ্যাকাডেমিতে নাচ শেখানো।' এভাবেই বিদেশ মণ্ডল থেকে কখন যেন রাম স্যার হয়ে উঠতে শুরু করলেন।

image


২০০৯ সালে প্রথমবার টালিগঞ্জে গণেশ আচারিয়া ডান্স অ্যাকাডেমির হেড টিচার হয়ে কলকাতায় আসেন রাম স্যার। ওই বছরই কাজ করেন একটি বাংলা চ্যানেলের রিয়্যালিটি শো 'নাচ-ধুম মাচালে' তে। এরপর কয়েক বছর তিনি কলকাতার এই অ্যাকাডেমি ছাড়াও এরাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অ্যাকাডেমির বিভিন্ন শাখায় নাচ শিখিয়েছেন। তাঁর কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেকেই আজ ছোটপর্দার বড় মুখ। কেউ কেউ প্রতিষ্ঠিত ডান্সার। তাঁর হাত ধরে অনেকে সাফল্যের মুখ দেখলেও কাঙ্খিত সাফল্য পাচ্ছিলেন না রাম স্যার। তাই এভাবে কাজ করতে ভালো লাগছিল না। রাম স্যারের মতে, 'আমার নাচ শেখাতে ভালো লাগত। হিন্দি ছবির কোরিওগ্রাফিও চলছিল। কিন্তু নিজের জীবনটা থেমে গিয়েছিল। অনেক পরিশ্রম করছিলাম, কিন্তু আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থার খুব একটা উন্নতি হয়নি। সেই কষ্ট আমায় তাড়া করে বেড়াচ্ছিল।' অবশেষে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। আর কারও ছত্রছায়ায় নয়। নিজের জীবনে নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন রাম স্যার। গণেশ আচারিয়া অ্যাকাডেমির কাজ ছেড়ে দেবেন ঠিক করেন। তবে তাঁর প্রাপ্তি, 'মাস্টারজি' তাঁর এই সিদ্ধান্তে বাধা দেননি। বরাবরের মতো উৎসাহ জুগিয়েছেন।

২০১৪ সালেই নিজের অ্যাকাডেমির সব পরিকল্পনা করে ফেলেন রাম স্যার। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহরে তিনি আগেই নাচ শেখাতে গিয়েছেন। তখনই দেখেছেন, এইসব শহরে প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। বিশেষ করে বলিউড এবং ওয়েস্টার্ন ডান্স শেখার কল্পনাও করতে পারেন না অনেকে। আর কলকাতায় নিজের ইন্সটিটিউট খোলার চেয়ে মফস্বলে খরচও কম। 'নিজের রোজগারের কিছু জমানো টাকা ছিল। কিন্তু সেই টাকায় বাড়ি ভাড়া নেওয়া গেলেও ডান্স ফ্লোর তৈরীর খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না। মুম্বইয়ের কয়েকজন ডান্সার, কোরিওগ্রাফার বন্ধু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।' বললেন রাম স্যার। জোরকদমে শুরু হয় নিজের অ্যাকাডেমি খোলার কাজ। নাচই তাঁর স্বপ্ন। আর নাচ নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখেন তাদের জন্যই তাঁর অ্যাকাডেমি। তাই নাম ঠিক হয় Dreamer's Dance Academy। যা এখন পরিচিত DDA নামে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে আসানসোলে চালু হয় DDA। তার ঠিক একমাসের মাথায় পুরুলিয়া শহরে আসে ড্রিমার্স ডান্স অ্যাকাডেমি। এপ্রিল মাসে রাঁচিতেও ফ্র্যাঞ্চাইজি খুলেছে DDA। জ্যাজ, রক অ্যান্ড রোল, হিপ হপ, কন্টেম্পরারি,সালসা, বি বয়িং সহ ওয়েস্টার্ন ডান্সের অধিকাংশ ফর্মই শেখানো হয় এখনে।

'প্রথম থেকেই স্টুডেন্ট পাচ্ছিলাম। কিন্তু টাকার সমস্যা ছিলই। মার্কেটিংয়ের জন্য বিনা পয়সায় অনেক শো করতে হয়েছে। সেই সময় বাইরে কোরিওগ্রাফির ডাক পেলেই ছুটে গেছি। সেখান থেকে পাওয়া টাকার পুরোটা দিয়েছি অ্যাকাডেমিতে। ' জানালেন রাম স্যার। এখন তিন জায়গায় কয়েকশো ছাত্রছাত্রী রয়েছে। সংখ্যাটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে এদের মধ্যে অনেকেইদরিদ্র পরিবারের। নিজে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেছেন। ফলে কষ্টটা বোঝেন। সেই কারণে বিনা পারিশ্রমিকেই বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ছেলেমেয়েকে নাচ শেখানো হয় তাঁর অ্যাকাডেমিতে।

আটবছর গণেশ আচারিয়া অ্যাকাডেমিতে নাচ শিখিয়েছেন। সেই সময় তাঁর কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেকেই এখন রাম স্যারের সহকারী। তাঁরা ড্রিমার্সের বিভিন্ন অ্যাকাডেমিতে অ্যাসিসট্যান্ট টিচার। এখন তাঁর আটজন সহকারী রয়েছেন। নিজের অ্যাকাডেমির কাজ যেমন এগোচ্ছে, তেমনই মনে মনে পরবর্তী লক্ষ্যও স্থির করে ফেলেছেন রাম স্যার। তিনি নিজে যে সাফল্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্য দিয়ে পূরণ করতে চান। 'আমার চিরকালের স্বপ্ন ছিল নিজের একটা বড় টিম হবে। আমি এই শহরগুলোয় এমন কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে পেয়েছি যারা আমাকে অবাক করেছে। যদি কোনওদিন এই ছেলেমেয়েদের নিয়ে আলাদা টিম গড়তে পারি, যারা আমার অ্যাকাডেমির প্রতিনিধিত্ব করবে কোনও বড় মঞ্চে, তাহলে বুঝব আমি সফল।' জানালেন রাম স্যার। তবে আরও শাখা খোলা এবং সঠিক প্রশিক্ষণের জন্য যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন তা শুধুমাত্র অ্যাকাডেমি থেকে পাওয়া মুশকিল। তাই মাঝেমাঝেই তাঁকে পাড়ি দিতে হয় মুম্বইতে। সম্প্রতি Shuddh desi romance, Kill dil, Abhinaychakra-র মতো ছবিতে 'মাস্টারজি'-র অ্যাসিস্ট্যান্ট কোরিওগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এবং সেই টাকার পুরোটাই ব্যয় হয়েছে ড্রিমার্স ডান্স অ্যাকাডেমিতে। সুযোগ পেলে এরপর কলকাতায় নিজের অ্যাকাডেমি খুলতে চান তিনি। তবে রাম স্যার স্বীকার করেন প্রকাশ, রোনাল, বন্ধু, আলোক, মিঠুন, নিশার মতো সহকারীরা পাশে না থাকলে তিনি সত্যিই এতটা পথ এগোতে পারতেন না।

মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়স। চোখে প্রচুর স্বপ্ন। যা এখন আর শুধু তাঁর নয়। তাঁর ছাত্রছাত্রীদেরও। DDA-র পথচলা সবে শুরু হয়েছে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন রাম স্যার। কারণ, সব ছাপিয়ে দারিদ্র্যকে ভুলতে পারেন না তিনি। তাই তো তাঁর জীবনের সব চেয়ে বড় এবং চূড়ান্ত স্বপ্ন, সারাজীবনের রোজগার করা টাকা দিয়ে দরিদ্রদের জন্য হাসপাতাল খোলা। রাম স্যারের স্বপ্ন সফরের সঙ্গী হয়েছে অসংখ্য ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। যারা সকলেই এখন Dreamer। তাদের সকলের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা রইল।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags