সংস্করণ
Bangla

কুন্তলের পাখির চোখ একটি অর্জুন আরেকটি দ্রোণাচার্য

10th Feb 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

হুগলীর প্রত্যন্ত এক গ্রাম থেকে উঠে আসা একটি মানুষ। স্বপ্ন দেখতেন ফুটবলার হবেন। কিন্তু ক্রমাগত চোটের জন্য ডাক্তার একসময় তাঁকে খেলাই ছেড়ে দিতে বলেছিলেন। ভাগ্যিস বলেছিলেন। না হলে দ্রোণাচার্য হওয়ার পর আর এক প্রাক্তন দ্রোণাচার্য, ইলিয়াস বাবর তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলবেন কেন, “আপনার হাতে ব্যাটনটা দিয়ে গেলাম”!

বছর ছয়েক আগের কথা। কুন্তল রায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে আছে। রাষ্ট্রপতিবভনের সেদিন তিলধারণের জায়গা ছিল না। দেশের খেলাধুলোয় সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়ার দিন। রাজীব খেলরত্ন থেকে পদ্মশ্রী সম্মান সেদিন দেওয়া হবে। খেলার দুনিয়ার মণিমানিক্যে ঠাসা রাইসিনা হিলের সেই সুসজ্জিত ঘর। রয়েছেন কুন্তল রায়ও। অ্যাথলেটিক্সে তাঁকে দেওয়া হবে দ্রোণাচার্য পুরস্কার। তখনই তাঁর দুই ছাত্রী, সোমা বিশ্বাস ও সুস্মিতা সিংহ রায় আর্ন্তজাতিক মঞ্চে বাংলার জন্য গৌরব নিয়ে আসছেন। বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক প্রতিযোগিতা থেকে। তাঁদের সাফল্যেই কুন্তলের সরল মুখে চওড়া হাসি। গর্বিত দ্রোণাচার্য। 

রাষ্ট্রপতিভবন থেকে দ্রোণাচার্য পুরস্কার নিয়ে কলকাতা ফেরার পরই কুন্তল রায় ভাসতে থাকেন শুভেচ্ছার স্রোতে! সাইনি উইলসন, অশ্বিনী নাচাপাদের দিয়ে শুরু হয়েছিল। কুন্তল বাবুর এখনও মনে আছে, রাজ্যবর্ধন রাঠৌরের শুভেচ্ছাবার্তা। কুন্তল বলছিলেন, “রাজ্যবর্ধন আমাকে ফোনে বলেছিল, দাদা পরিকাঠামোর যথাযথ সহয়াতা না পাওয়া সত্ত্বেও আপনার কাজ ভবিষ্যতের অ্যাথলেটিস জগতে উদাহরণ হয়ে থাকবে।”

image


১৯৭৭ সালে স্পোর্টস অথিরিটি অফ ইন্ডিয়ার পাতিওয়ালা থেকে কোচিং-এর ডিগ্রি নিয়ে আসার পর থেকে গত চল্লিশ বছর ধরে অ্যাথলিট গড়ার কাজ করে চলেছেন কুন্তল রায়। সোদপুরের একটি ছোটো মাঠেই তার সমস্ত সাধনা। এখনও ভোলেননি প্রাক্তন জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন মধুমিতা সিংহ বিস্তের পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তা। দ্রোণাচার্য হওয়ার পর মধুমিতা বলেছিলেন, “দাদা, এখনও ভুলতে পারছি না কলকাতায় জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের মাত্র চারদিন আগে আমার হাঁটুতে শুরু হওয়া ব্যথা- আপনি সারিয়ে দিয়েছিলেন। আর সেবার কলকাতা ন্যাশনলে মহিলা সিঙ্গেলসে আমিই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম।” হাসছেন কুন্তল রায়। বললেন, “মধুমিতাকে আমি ওই ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের আগের তিনটে দিন বিশেষ ধরণের একটা ট্রেনিং করতে দিয়েছিলাম।” তবে দ্রোণাচার্য হওয়ার পরে অজস্র শুভেচ্ছার মধ্যে দ্রোণাচার্য অ্যাথলেটিক্স কোচ ইলিয়াস বাবরের কথা কুন্তল রায় হয়তো সারাজীবন মনে রাখবেন। কুন্তল বলছিলেন, “কলকাতায় ফেরার পর বাবর ফোন করেছিলেন আমাকে। বলেছিলেন, ট্রফিটার দিকে বেশি তাকাবে না। সাফল্যের চোঁয়া ঢেকুর উঠবে! কাজের উপর প্রভাব পড়বে। আপনাকে তো অ্যাথলিট গড়ার কারখানাটা চালিয়ে যেতে হবে।”

কিন্তু দ্রোণাচার্য পুরস্কার পাওয়ার মতোই আনন্দ তাঁর জীবনে আরও একটা ঘটনায়। গত সাতচল্লিশ বছর ধরে যা তাঁর স্বপ্ন ছিল। তাঁর কোচিং সেন্টারে যত ছেলে মেয়েই ভর্তি হোক না কেন, তাদের কাছে তিনি শেখার টাকা নেবেন না! তাঁর স্বপ্ন এখনও ধরে রাখতে পেরেছেন কুন্তল বাবু। আড়াইশো ছেলে মেয়ের কাউকে এসিসি তে ট্রেনিং করার জন্য টাকা দিতে হয় না। বরং রাজ্য বা জাতীয় পর্যায়ে পারফরম্যান্স করা প্রতিভাবান ছেলে মেয়েদের মাসিক বৃত্তিও দেওয়া হয়। কুন্তল বাবু বলেন “ সুপা পরভিন। হাডলসে আর লংজাম্পে ভীষণ সম্ভবনাময়, অথচ খুব গরিব। ওকে প্রতি মাসে পাঁচশ টাকা করে বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। এরকম আরও কয়েকটি ছেলে মেয়ে আছে যারা স্কলারশিপ পায়”। কিন্তু অর্থের জোগান আসে কি ভাবে? ১৯৭৭ সালে এন.আই.এস থেকে কোচিং ডিগ্রী নিয়ে আসার পর থেকেই কুন্তল রায়ের অ্যাথলেটিক্স কোচের জীবন পেশাদারিভাবে শুরু হয়ে যায়। তিনি জোগ দেন স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া(সাই)-য় কোচ হিসাবে। বেতনের অর্ধেক টাকাই তিনি খরচ করতেন তাঁর হাতে গড়া এসিসি এর জন্য। এছাড়া এসিসি-র তহবিলে জমা পড়ে কুন্তল রায়ের প্রতিষ্ঠিত প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের অনুদান। কুন্তল বাবুর প্রাক্তন ছাত্রাছাত্রী? সোমা বিশ্বাস, সঞ্জয় রাই, ঝুমা খাতুনের মতো-জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা অ্যাথলিটরা। বর্তমানেও আছেন সুস্মিতা সিংহ রায়ের মতো আর্ন্তজাতিক অ্যাথলিট। এদের পাঠানো নিয়মিত অনুদান এসিসি-র বড় শক্তি। কুন্তল বাবু জানালেন, গত কুড়ি বছরে স্থানীয় সাংসদের এম.পি তহবিল থেকে তাঁর কোচিং সেন্টারকে দুবারে আট লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এই আট লক্ষ টাকায় কোচিং সেন্টারে তৈরি হয়েছে দুটি আধুনিকতম মাল্টিজিম। মাঠে এসছে আমুল পরিবর্তন। ঘাস ছেঁটে সেখানে নিয়মিত জল আর সার দিয়ে দৌড়ানোর ট্র্যাক আলাদা ভাবে তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন লঙজাম্পের লেন, কৃত্রিম টার্ফ, আর সেটাকে বসানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থেরও আবেদন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থমন্ত্রকে। কুন্তল বললেন, “ গোটা রাজ্য ঘুরে দেখতে পারেন। সাই ছাড়া আর কোনও অ্যাথলেটিক্স সেন্টারে এসিসি-র মতো উন্নত পরিকাঠামো পাবেন না। এখানে এখন মাসিক বেতনে দু’জন কোচ আছেন। তাঁরা আমারই ছাত্র।” গত দু’বছর ধরে রাজ্য অ্যাথলেটিক্স টুর্নামেন্টে দলগত বিভাগে সবচেয়ে বেশি সোনার পদক নিয়ে যাচ্ছে এসিসি। গতবছরও রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপে, চল্লিশটা সোনা জিতে প্রথম হয়েছে কুন্তলের ক্লাব। তবে রাজ্য পর্যায়ের টুর্নামেন্টে সোনা জিতে তৃপ্তি নেই দ্রোণাচার্যের। তিনি চান, আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে এসিসি থেকে গড়ে ওঠা অ্যাথলিটরা জাতীয় দলের হয়ে পদক জিতে ফিরেছেন। স্বপ্নের আরো কিছু অবশিষ্ট আছে।

একষট্টি বছর বয়সী কুন্তল চান ,”আমার হাতে তৈরি হওয়া আর্ন্তজাতিক অ্যাথলিটরা এসিসির দায়িত্ব নিক। পরের প্রজন্মের হাতে ব্যাটন টা তুলে দিতে পারলেই স্বপ্ন সফল হবে।”

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags