সংস্করণ
Bangla

বীরেনের তাঁতে ভারত বিজয়

Tanmay Mukherjee
28th Oct 2015
Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share

সস্তার পাওয়ার লুমের শাড়ির চোখরাঙানি আছে। নকল শাড়ির দৌরাত্ম্য রয়েছে সমান তালে। অসম লড়াইয়ের মাঝেও হস্তচালিত তাঁত নিজস্বতায় এখনও মাথা তুলে রয়েছে। একটু ভুল হল, হাতে বোনা তাঁত এখন বুঝিয়ে দিয়েছে বাংলার হস্তশিল্প এখন কত উঁচু দরের। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থেকে দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁতের তৈরি ওয়াল হ্যাঙ্গিং-এ অভিভূত। এর নেপথ্যে রয়েছেন নদিয়ার ফুলিয়ার এক উদ্যোগপতি। দেশের সেরা বস্ত্রশিল্পীর সম্মান রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। এমনকী শাড়ির ওপর কৃত্তিবাসের রামায়ণ নিপুণভাবে তুলে ধরে লিমকা বুক অব রেকর্ডে নাম তুলে ফেলেছেন তিনি। তাই তাঁর ২০ লক্ষ টাকা দামের শাড়ি নিয়ে দেশজুড়ে আগ্রহ তৈরি হয়। খ্যাতির সরণিতে শুধু আটকে থাকা নয়, আরও বেশি করে যাতে মানুষ এই পেশায় আসেন এর জন্য নিরলস চেষ্টা চালাচ্ছেন ষাটোর্ধ্ব।


image


আলাপ করুন। বীরেন কুমার বসাক। ফুলিয়ার চটকতলার এই তাঁতশিল্পী ঝাঁকের কই হননি। মাত্র আট বছর বয়সেই মাকুড় কেরামতি বুঝে যান। তাই বাবা বঙ্কবিহারী বসাকের সঙ্গে যখন কলকাতায় বাড়ি বাড়ি তাঁত শাড়ি ফেরি করতে আসতেন, তখন থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন এ শহরের পালস। মানুষকে নতুন নতুন ডিজাইন দিলে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না, এই সত্যটা প্রয়োগের কাজটা নীরবে শুরু করেছিলেন। কীভাবে আরও নতুন নকশা তৈরি করা যায় তার জন্য শাড়িতে নানা রকম সুতো দিয়ে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা হয়। এর জ‌ন্য রাজ্যের নানা জায়গায় প্রদর্শনীতে পৌঁছে যেতেন বীরেনবাবু। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন নকশাগুলি। আর বাড়িতে ফিরে সেইসমস্ত ভাবনা শাড়িতে তুলতে থাকেন। আর এই ছকভাঙা পথ নতুন রাস্তা খুঁজে দেয়। আর মহাজনের থেকে এনে শাড়ি করা নয়, বীরেনবাবুর নিজেই শাড়ি বানানো শুরু করেন। তাঁর নিজস্ব ভাবনার এইসব শাড়ি নিয়ে আগ্রহ দ্রুত বাড়তে থাকে। এই চাহিদা মেটাতে কলকাতার গোলপার্কে একটি শোরুম করেন তিনি।


image


আম আদমির মনের ইচ্ছে ধরে ফেলার পর তথাকথিত খাস আদমিরাও খোঁজ নিতে থাকেন বীরেন বসাকের শাড়ি। হেমন্ত মুখোপাধ্যা, সত্যজিৎ রায়, অপর্ণা সেন, মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় থেকে ওস্তাদ আমজাদ আলি খান। বীরেন বসাকের শাড়ির মুগ্ধদের তালিকা শেষ হতে চায় না। দেশের ভিভিআইপিরা নতুন ডিজাইনের ব্যাপারে প্রায়ই খোঁজ করেন ফুলিয়ার এই তাঁতশিল্পীকে।


image


যৌবনেই বুঝে গিয়েছিলেন গতানুগতিক তাঁত শাড়ির গণ্ডীতে থাকলে একটি জায়গায় আটকে থাকতে হবে। বাজার যা চায় তা না দিতে পারলে হারিয়ে যেতে হয়। তাই আরও কিছু করার তাগিদে জোর দেন ওয়াল হ্যাঙ্গিং -এর ওপর। কখনও এই কাজে নিরক্ষরতা দূরীকরণের নানা বার্তা উঠে আসে, কখনও নৌকাবিলাসের নানা মুহূর্ত। কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ণকে ওয়াল হ্যাঙ্গিং-এর মধ্যে তুলে আনার ভাবনাও তাঁর। জামদানির কাপড়ের ওপর এই কাজ করতে প্রায় আড়াই বছর লেগেছিল। নিষ্ঠার স্বীকৃতিও মিলেছে। গত বছর লিমকা বুক অফ রেকর্ডে জায়গা করে নেয় তাঁর এই শিল্পকর্ম।


image


কিছু দিন আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ওয়াল হ্যাঙ্গিং উপহার দিয়েছেন বীরেনবাবু। তাঁর শিল্পকর্মের মধ্যে ছিল কন্যাশ্রীর ছবি ও তার চারপাশে কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন কবিতার লাইন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর জন্যও অভিনব ওয়াল হ্যাঙ্গিং তৈরি করেছেন এই শিল্পী। জনসমুদ্রের মাঝে বক্তব্য রাখছেন নরেন্দ্র মোদি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো রয়েছেন শ্রোতারা। তাঁর এই ওয়াল হ্যাঙ্গিং জুড়ে রয়েছে এমনই ছবি। উৎকৃষ্ট মসলিনের কাপড়ের ওপর তৈরি হয়েছে এই আশ্চর্য কাজ। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এই শাড়ির পিছনে রয়েছে অনেক পরিশ্রমের কথা। একজন তাঁতশিল্পী প্রায় ৬ মাস ধরে এই কাজ করেছেন। এর জন্য মজুরি গিয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার টাকা। তাঁর এই শিল্পকর্ম প্রধানমন্ত্রীকে নিজের হাতে করে তুলে দিতে চান বীরেন বসাক। বেশ কিছু দিন আগে অবশ্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর থেকে পেয়েছেন দেশের সেরা বস্ত্রশিল্পীর পুরস্কার। মোঘল আমলের বিশিষ্ট বস্ত্রশিল্পী ‘সন্ত কবির’-এর নামানুসারে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ‘সন্ত কবির’ সেই সময় কাপড় বুনতে বুনতেই কবিতা লিখতেন। তাঁরই স্মৃতিবিজড়িত এই পুরস্কার পান বীরেনবাবু। ২০০৯ সালে বস্ত্র দফতর থেকেও তিনি বিশেষ শংসাপত্র পান। এর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে জওহরলাল নেহরু, কিংবা প্রাক্তন দুই মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টচার্য। এদের প্রত্যেকের প্রতিকৃতি বীরেনবাবুর ওয়াল হ্যাঙ্গিং-এ ‌রয়েছে।


image


এত স্বীকৃতি, সম্মান। দেশজুড়ে চাহিদা। এর মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি করার কাজটা চালিয়ে যাচ্ছেন পঁয়ষট্টি বছরের এই ‘তাঁতযোদ্ধা’। ‌এলাকার মেয়েদের বিনা পয়সায় নানা রকম নকশা শেখান বীরেনবাবু। তাঁর কথায়, কাজ এখনও অনেক বাকি। তাঁর দাদা ধীরেন বসাক ও ছেলে অভিনবও এই লড়াইয়ে সামিল। আসলে শান্তিপুর, ফুলিয়া জুড়ে দ্রুত বাড়ছে পাওয়ার লুম। যন্ত্রচালিত তাঁতে খুব দ্রুত শাড়ি তৈরি হয়। ফলে দামও কম। এর পাশাপাশি দালালদের জন্য ফুলিয়া, শান্তিপুরে এসে অনেকে কম দামের শাড়ি বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। এতসব উতরাইয়ের মাঝে দাদা‌-ভাই-ছেলে মিলে হস্তচালিত তাঁতের পুনরুজ্জীবনে নিজেদের মতো করে চেষ্টা করছেন। চারশো টাকা থেকে শুরু হয় কুড়ি লক্ষ টাকার শাড়ি পাওয়া যায় বীরেনবাবুর তাঁতঘরে। যে শাড়িগুলি প্রতিটিই হাতে বোনা। হাতের কাজের মধ্যে যে স্নিগ্ধতা, সূক্ষ্মতা রয়েছে তা ভাল জানেন তাঁর ক্রেতারা। তাই নতুন কিছুর তাঁরা ঢুঁ মারেন বীরেন বসাকের কাছে। ফুলিয়া, হবিবপুর, শান্তিপুর, করিমপুর মিলিয়ে এই মুহূর্তের এই তাঁত উদ্যোগীর হাত ধরে প্রায় ৫ হাজার তাঁতশিল্পীর কর্মসংস্থান হয়েছে। পরোক্ষভাবেও কয়েকশো মানুষও উপকৃত।

Add to
Shares
2
Comments
Share This
Add to
Shares
2
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags