সংস্করণ
Bangla

পেসার ইকরা রসুল, বারামুলার মেয়েটা এখন শিরোনামে

3rd Sep 2017
Add to
Shares
28
Comments
Share This
Add to
Shares
28
Comments
Share

বারামুলার এক রক্ষণশীল পরিবারের পর্দার আড়ালে কী কাণ্ড ঘটে যাচ্ছিল ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কেউ। জানতেন শুধু মা, পরিবারে একমাত্র, যিনি বরাবর উৎসাহ যুগিয়েছেন। যখন ম্যাচ থাকত বাকিরা জানতেন মেয়ে বেড়াতে গিয়েছে আত্মীয় বাড়ি। তেমন বাড়ির মেয়ের পেসার হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখাও প্রতিস্পর্ধার। ইকরা রসুলকে কিন্তু রোখা যায়নি। কাশ্মীরে ঘরবাড়ি পরিজন ছেড়ে কলকাতায় ক্রিকেট ধ্যানে মগ্ন সপ্তদশী কাশ্মীরী কন্যার কাহিনি শুনলে গায়ে কাটা দেবে। রক্ষণশীল বাড়ির চার দেওয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে আসা চাট্টিখানি কথা নয়। আর সিডনিতে মাইকেল ক্লার্কের ক্রিকেট আকাদেমিতে যাওয়ার টিকিট পাকা করে ফেলা তো এক অবিশ্বাস্য উপাখ্যান। ইকরার প্রতি পদে পদে ছিল কঠিন লড়াই। 

জম্মু-কাশ্মীরের বারামুলা। নামটা বারংবার বেঠিক পরিপ্রেক্ষিতে শিরোনামে উঠে এসেছে। কিন্তু এবার উপত্যকার সেই হিমেল হাওয়া বেয়ে ইকরার ঘাতক বল বাইশ গজকে শাসন করছে। যে পরিবারে ইকরার জন্ম সেখানে বোরখার আড়ালে মেয়েদের আস্ত দুনিয়া। খেলাধুলোয় কেরিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখা গুনাহ। 
image


কিন্তু ইকরা ছোটবেলা থেকেই অন্য রকম। ‘ক্রিকেট কে লিয়ে ম্যাঁয় কুছ ভি কর সাকতি হুঁ’, সহজ সরল অথচ অদ্ভুত এক মানসিক দৃঢ়তায় অনায়াসে বলে ফেললেন বছর সতেরোর মেয়েটি। টিম ইন্ডিয়ার জার্সির স্বপ্ন তাড়া করতে করতে ঘর পরিবার ছেড়ে এখন কলকাতায় ইকরা। ঝুলন গোস্বামী ওঁর আইডল। এই ঝুলনই আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টসের ট্রায়াল থেকে খুঁজে বের করেন কাশ্মীরী এই প‌্রতিভাকে। ‘ইকরা অসাধারণ। লম্বা আর শক্তি দুইই ওর প্লাস পয়েন্ট। সত্যি জোরে বল করতে পারে। তার চাইতেও বড় কথা ক্রিকেট ওর আবেগ। কোচের কাছ থেকে শুনেছি আমি যখন দেখেছিলাম তার চাইতে অনেক উন্নতি করেছে এখন। ওর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল’, বলেন স্পোর্টস স্কুলের মেন্টর ঝুলন গোস্বামী।

আদিত্য অ্যাকাডেমি, বারাসাতের ক্লাস টুয়েলভের ছাত্রী ইকরা আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টস, নাগের বাজারে গত তিন মাস কঠোর অনুশীলন করছে। তার ফলও মিলেছে। সিডনিতে মাইকেল ক্লার্কের ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে ট্রেনিং প্রোগ্রামের জন্য যে ৩০ জনকে বাছা হয়েছে ইকরা তাদের অন্যতম। এতটুকু পথ পেরোনো বিরাট কোহলির এই ফ্যানের জন্যে বেশ কঠিন ছিল। বারামুলায় গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকে ফুটবল, ভলিবল, ক্রিকেট থেকে খোখো— আউটডোর গেমগুলি রীতিমতো দাপিয়ে খেলত। পাশে মা ছিলেন। স্কুলের স্পোর্টস টিচার

সরফরাজ নবি ছাত্রীর মেধা চিনে নিয়েছিলেন। তিনিই ইকরাকে প্রথমে ক্রিকেট খেলায় উৎসাহ দেন। লম্বা আর জোরে বল ছুড়তে পারেন বলে স্যার ফাস্ট বোলার হতে বলেছিলেন। পেস বোলিং শেখাতে শুরুও করেন। তখন থেকে ক্রিকেটের প্রেমে পড়ে যান ইকরা। ক্রিকেটই জীবন হয়ে ওঠে। বিরাট কোহলির এই অন্ধ ভক্তের প্রিয় পেসার মহম্মদ আমের। ‘ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচ কখনও মিস করেন না। কোহলি আর আমেরের অক্যাশন একসঙ্গে দেখতে পান।

২০১৩ থেকে ক্রিকেট শুরু। মা ছাড়া বাড়ির আর কেউ জানত না সেটা। প্র্যাকটিস না করেই ম্যাচ খেলতে যেতে হত। চুল ঢেকে। স্কার্ফ বা টুপি পরে। বল করার সময় চোখে চুল পড়ে বলে একঢাল চুল ছেঁটেই ফেলেন ইকরা।

অ্যাসোসিয়েশনের কোচদের নজর এড়ায়নি ইকরার ইচ্ছে আর প্রতিভা। বাড়ির হাজার বাধা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ২০১৪ সালে অনূর্ধ্ব ১৯ দলে জায়গা করে নেন। পরের ৩ বছর টানা জাতীয়, রাজ্য, জেলা, আঞ্চলিক মিলিয়ে একের পর এক টুর্নামেন্টে অংশ নেন। এখনও পর্যন্ত সেরা স্পেল জাতীয় পর্যায়ে তেলেঙ্গানার বিরুদ্ধে ম্যাচে। চার ওভারে ৭ রান দিয়ে চার উইকেট। কোনও রকম প্র্যাকটিস, পেশাগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই খেলে গিয়েছেন। যা শিখেছেন স্কুলে সফররাজ স্যারের কাছ থেকে শেখা। জাতীয় স্তরে জায়গা করে নিতেই বাড়িতে একরকম বুঝিয়েই দেন ইকরা, ক্রিকেটই তার ভবিষ্যৎ হতে চলেছে এবং তার জন্য অন্য শহরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হবে। আর্থিক সামর্থ্য আর সামাজিক দিক থেকে পরিবারের সম্মতি পাওয়া সোজা ছিল না। ঠিক সেই সময় আদিত্য স্কুল অব স্পোর্টস আশীর্বাদ হয়ে আসে ইকরার জীবনে। সেই সময় ওদের স্পোর্টস স্কুলের জন্য নতুন প্রতিভা খুঁজছিলেন ওরা। ইকরার কথা কানে আসে। ইকরার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু সম্মতি আদায় করাটাই ছিল আদিত্য অ্যাকাডেমি কর্তৃপক্ষের কাছে বিশাল চ্যালেঞ্জ। সেটা ম্যানেজ হতেই ওকে স্পোর্টস স্কলারশিপ দিয়ে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। আর সেটায় কাজের কাজ হয়েছে। যেভাবে প্রতিদিন ওর বোলিং অ্যাকশনের উন্নতি হচ্ছে তাতে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা, আত্মবিশ্বাসী আদিত্য গ্রুপের চেয়ারম্যান অনির্বাণ আদিত্য।

এখন ঘণ্টায় ১০৫ কিলোমিটার গতিতে বল করছেন ইকরা। ইকরা স্বপ্ন দেখেন সঠিক লাইন আর লেন্থ মেনে একের পর এক বল করছেন। জাতীয় দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের ক্রিজ। প্রতিটা বলের স্পিড উঠছে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার।

Add to
Shares
28
Comments
Share This
Add to
Shares
28
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags