সংস্করণ
Bangla

পুরুষদের টেক্কা দিয়ে রেমাদেবীর স্বপ্নসফল

19th Aug 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

কেরলের অখ্যাত গ্রাম – নিমম। সেই গ্রামেরই এক পরিবারের মেয়ে রেমাদেবী থোট্টাথিল। বড়দা এনিসিসি ক্যাডেট। দাদার কাছে সামরিক বাহিনী নিয়ে নানা গল্প শুনে রেমার মন রোমাঞ্চে ভরে উঠত। দাদার সেনায় যোগ দেওয়ার ইচ্ছে কিশোরী রেমার মনে সেনাবাহিনী নিয়ে কৌতূহল জাগাত। কিন্তু ওই পর্যন্তই। 

image


আটের দশকে মধ্যবিত্ত ঘরানায় বড় হওয়া রেমাদেবীর সামনে কেরিয়ার বেছে নেওয়ার মাত্র দুটিই বিকল্প ছিল। এক, বাবার দেখানো পথে ডাক্তার হওয়া, অথবা ঝোলা ভর্তি ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষক হওয়া। কিন্তু কথায় বলে না, জীবন প্রতি মুহূর্তে বদলায়। রেমাদেবীর ক্ষেত্রেও সেটাই হল। হঠাৎই একদিন সুযোগ এল নিশ্চত ভবিষ্যৎ ছেড়ে দুর্গম পথে বেরিয়ে পড়ার।

সয়মটা ছিল ১৯৯২ সালের জুলাই মাস। নৌবাহিনীতে প্রথম মহিলা সদস্য নেওয়ার বিজ্ঞাপন দেখে রেমার দাদাই বোনের জন্য ফর্ম নিয়ে এসেছিলেন। স্বপ্নডানায় উড়ান ভরার সেটাই ছিল সোপান। দেরি না করে ভোপালে ইন্টারভিউ দিতে গেলেন রেমা। চারদিন ধরে নাগারে পরীক্ষা – কখনও বুদ্ধিমত্তা, কখনও মেধা, কখনও বা কঠিন মেডিক্যাল টেস্ট। ভারতীয় নৌবাহিনীতে এর আগে কখনও মহিলা সদস্য নেওয়া হয়নি। কিন্তু সেসময় দেশ যেমন আর্থিক উদারনীতিতে গা ভাসিয়েছিল, তেমনভাবেই সামরিক বাহিনীতেও উদারনীতির দোর খুলে গিয়েছিল। তাই বাহিনীতে মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত না করার সাবেক মানসিকতা ত্যাগ করে তাদের জন্যও দরজা খোলা হল। আর সেই দরজা দিয়ে আসা প্রথম আলোর কিরণ যাঁদের স্পর্শ করেছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম - রেমাদেবী থোট্টাথিল।

ভোপালে সমস্ত পরীক্ষায় পাস করে ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রথম মহিলা সদস্য হিসেবে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়েছিলেন রেমাদেবী সহ তিনজন মহিলা। ১৯৯৩ সালের ৯ অগাস্ট, নৌবাহিনীর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারের প্রথম মহিলা ব্যাচের সদস্য হিসেবে তাঁরা গোয়ার নেভাল অ্যাকাডেমিতে যোগ দিলেন। পুরুষতান্ত্রিক একটা ঘেরাটোপে ওই মহিলাদের জন্য মোটেও কোনও আলাদা সুযোগ সুবিধা ছিল না। পোশাক থেকে প্রশিক্ষণ – সবই ছেলেদের সঙ্গে,ছেলেদের মতো। ‘কিন্তু আমরা পেরেছিলাম, বাহিনীর পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে সমানে টেক্কা দিয়েছিলাম’, সেই ফেলে আসা দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে বলে ওঠেন রেমাদেবী। আর এই টেক্কা দিতে গিয়ে অচিরেই তাঁরা এক ইতিহাস গড়ে ফেলেছিলেন। যে ইতিহাস দেশের ঐতিহ্যশালী নৌবাহিনীতে মহিলাদের জন্য স্থায়ী আসন গড়ে দেওয়ার গল্প বলে।

image


বিশ্বের কঠিনতম চাকরিগুলির অন্যতম, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে কাজ করা। প্রতি মুহূর্তে টেনশন, এক চুল ভুল করার অবকাশটুকুও নেই। কানে সমানে বেজে চলা পাইলটদের কথোপকথন, আকাশে উড়তে থাকা বিমানগুলির দিকে নজরদারি, তারইমাঝে মাথা ঠাণ্ডা রেখে পাইলট ও সেনাঘাঁটির মধ্যে সমন্বয়সাধন। সিনেমায় যেমনটা দেখায়, ঠিক তেমনই কর্মচঞ্চল আবহ। হাসতে হাসতে এসব চ্যালেঞ্জ জয় করেছেন রেমাদেবী। আবার পুরুষ কলিগদের পিছনে ফেলে এয়ার ফোর্স অ্যাকাডেমিতে হওয়া প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষায় ফার্স্টও হয়েছেন।

১৯৯৩ থেকে ২০০৩, শর্ট সার্ভিস কমিশনে লেফটেন্যান্ট কম্যান্ডার হিসেবে নৌবাহিনীর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলে ছিলেন রেমাদেবী থোট্টাথিল। আরও চারটে বছর বাহিনীতে কাজ করতেই পারতেন, কিন্তু সেক্ষেএে পেনশন খোয়াতে হত। সামরিকবাহিনীতে মহিলাদের এর থেকে বেশি সুযোগ দেওয়া হত না। তাই ২০০৩ সালেই ইন্ডিয়ান নেভিতে নিজের বর্ণময় চাকরিজীবনকে বিদায় জানাতে কার্যত বাধ্য হন রেমাদেবী। তবে যিনি চাকরি জীবনের শুরু থেকেই চ্যালেঞ্জে অভ্যস্ত তিনি কি আর চ্যালেঞ্জ ছাড়া বাঁচতে পারেন ! নেভি ছাড়ার পর কিছুদিন এক ব্রিটিশ সংস্থা ও কয়েকটি আইটি কোম্পানির মানব সম্পদ বিভাগে কাটিয়েই রেমাদেবীর কাঁধে এসে পড়ে এক মদের কোম্পানির বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও মানবসম্পদ বিভাগের গুরুদায়িত্ব। কর্মী ইউনিয়নকে সামলানো, আবগারি দফতরের সঙ্গে সমন্বয়, সরকারি নিয়ম-নীতির ঘোরপ্যাঁচ। এই সমস্ত কিছু সামলানো একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল বলেই মনে করেন রেমাদেবী। সেখানে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে ফের আইটি সেক্টরেই ফেরত এসেছেন রেমাদেবী। জেট প্লেনের হুঙ্কার, পাইলটদের রোমাঞ্চকর জগতে অভ্যস্ত মস্তিষ্ক এখন আইটিসি ইনফোটেকে প্রতিভা অন্বেষণের কাজ করে। প্রাক্তন সেনা কম্যান্ডার স্বামী ও দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁর সুখের পরিবার। এরই মধ্যে একবার মিসেস চেন্নাই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন তিনি।

সামরিক বাহিনীর দুনিয়া, কর্পোরেট জগৎ থেকে সুখী গৃহকোণ। এই রকমারি দায়িত্বগুলো সহজেই সামলে সেই আদি প্রবাদটাকেই আরও একবার প্রমাণ করেছেন রেমাদেবী থোট্টাথিল – যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে। তবে তাঁর নিজের কথায় –‘আমি কখনও সুপার ওম্যান হওয়ার চেষ্টা করিনি, নিজের খামতিগুলোকে মেনে নিয়েই নিজেকে উৎকৃষ্ট করে তোলার চেষ্টা করে গেছি’। তিনি দৃঢ়ভাবে মনে করেন – ‘স্বপ্ন সত্যি হয়, আলবাৎ হয়, কেউ যদি তোমায় বিশ্বাস নাও করে, নিজের ওপর ভরসা রেখে লক্ষ্যে অবিচল থাকলে স্বপ্ন সত্যি হবেই’।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags