সংস্করণ
Bangla

'জয়পুর ফুটে' বাধার পাহাড় ডিঙোলেন দেবেন্দ্র

13th Oct 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

সালটা ১৯৬৯। জয়সলমীরের তৎকালীন জেলাশাসক দেবেন্দ্ররাজ মেহেতা। পোখরাণে এক মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। বাঁচার কোনও আশাই ছিলনা। পায়ের ফিমার ভেঙে ৪৩ টুকরো হয়ে গিয়েছিল। গল্পটা এখান থেকেই শুরু। শেষ আশ্চর্য এক পাহাড় ডিঙনোয়।

কোনও ক্রমে প্রাণে বাঁচলেও, নানা ডাক্তার বদ্দি, বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি কোনও কিছুতেই একশ শতাংশ সুস্থ হওয়ার আশা ছিল না। জীবনটা অকেজোই প্রায় হয়ে গিয়েছিল দেবেন্দ্রর। আরও সুচিকিৎসার খোঁজে আমেরিকা পাড়ি দেন। ফিরে এসে খুঁজতে থাকেন একটা জটিল উত্তর। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে যাদের আর্থিক ক্ষমতা নেই সেই সব শারীরিক বিকলাঙ্গদের চিকিৎসা করানোর উপায় কী হতে পারে। ১৯৭৫ সাল। দুর্ঘটনার বছর ছয়েকের মধ্যে উত্তরটা খুঁজেও পান দেবেন্দ্র। জন্ম নেয় "ভগবান মহাবীর বিকলাঙ্গ সহায়তা কেন্দ্র"।

এঁরা আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের চিকিৎসায় সহায়তা দেন। শুধু অক্ষম ব্যক্তিকে চলনক্ষম করে তোলাটাই সব নয়, তাঁদের সামাজিক হৃত মর্যাদা এবং আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। দেশে বিদেশে বিনামূল্যে কৃত্রিম অঙ্গ,ক্যালিপার বিতরণ করেন। ব্যথিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে আবেদন নোবেলজয়ী ডঃ আলবার্ট স্কোয়েৎজার করেছেন তাতেই আলোড়িত দেবেন্দ্ররাজ।

image


B.M.V.S.S এর জন্মের বছর সাতেক আগে থেকেই জয়পুরের স্বামী মান সিং হাসপাতালে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম পা বা "জয়পুর ফুট"। এটি এক ধরনের রাবার দিয়ে তৈরি প্রস্থেটিক পা। যাঁদের হাঁটুর নীচে সার্জারি হয় তাঁদের B.M.V.S.S বিনামূল্যে এই কৃত্রিম পা লাগিয়ে দেয়। হাঁটা, দৌড়ঝাঁপ বা পা মুড়ে বসা সব করতে পারেন জয়পুর ফুট পরা ব্যক্তি। গুনগত মানের জোরে জয়পুর ফুট ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে বিশ্বের অন্য প্রান্তেও।

জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভৌগোলিক সীমারেখা নির্বিশেষে দরিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষের সহমর্মিতার সঙ্গে সেবা দেয় B.M.V.S.S। কিছুক্ষেত্রে অল্পবয়স্ক বিকলাঙ্গদের বিশেষ ভোকেশনাল প্রশিক্ষণও দেন তাঁরা। এই প্রশিক্ষণ প্রতিবন্ধীদের মনোবল বাড়ায় এবং সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করে। প্রত্যন্ত গ্রামেও এই সংস্থা পুনর্বাসন শিবির এবং প্রোগ্রাম করে। জয়পুরকে কেন্দ্র করে এঁদের আরও ২২টি শাখা আছে। শ্রীনগর থেকে চেন্নাই, গৌহাটি থেকে আহমেদাবাদ এবং দিল্লী, মুম্বই, পুনে সব মেট্রো শহরে B.M.V.S.S ফিটিং সেন্টার রয়েছে।

image


কম দামে উন্নতমানের কৃত্রিম অঙ্গ তৈরির গবেষণা চালাচ্ছেন এঁরা। সেই কাজে হাত মিলিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যান্ডফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ম্যাসাচুসেটস্ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, ভারজিনিয়া টেক ইউনিভার্সিটি,ডাও ইন্ডিয়া,আই আই টি, ইসরোর মতো বহু সংস্থার সঙ্গে। তাঁরা আভ্যন্তরিণ গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করেছেন। সীমিত সরকারী অর্থ তাই অনুদানের জন্যে ফিলানথ্রোপিষ্ট এবং ধনী রোগীদের কাছে আবেদন করতে হয়। প্রকৃত সাফল্যের কথা জানতে চাওয়ায় দেবেন্দ্র বললেন শারীরিক কষ্ট কমানো,আর্থিক স্বনির্ভরতা ও সামাজিক মর্যাদা ফিরে পাওয়াই হল আসল বিষয়। 

দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ভারতীয় অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী সুধাচন্দন। দুর্ঘটনায় তাঁর এক পা হারিয়ে ফেলেছিলেন। জয়পুর ফুট পরে তিনি আবার নৃত্যমঞ্চ দাপিয়ে, তাঁর জীবনের মূল স্রোতে ফিরে এসেছেন।

ভালো কাজের স্বীকৃতি

দেবেন্দ্ররাজ ২০০৮ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কার পান। B.M.V.S.S ১৯৯৮ সালে প্রতিবন্ধী পুনঃনির্বাসনের জন্য এবং ১৯৮২ সালে শ্রেষ্ঠ প্রতিবন্ধীদের জন্য কর্মরত সংস্থা হিসাবে জাতীয় পুরস্কার পায়। এখন B.M.V.S.S. পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিকলাঙ্গ সহায়তা কেন্দ্র। এঁদের ছোঁয়ায় ভারতে ও বিদেশে ১৫ লক্ষেরও বেশি প্রতিবন্ধী ও পোলিও রোগী জীবনের ছন্দ ফিরে পেয়েছেন। ডঃ মেহেতার মতে আর্তের সেবা করার মধ্যে অতুলনীয় আনন্দ পাওয়া যায়। এ যেন শাস্ত্রের বাণী: "আনন্দ হি কেবলম।"

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags