সংস্করণ
Bangla

সৌর বিদ্যুতে নদীর জল তুলে সেচের কাজে লাগাচ্ছে হাটপুকুরিয়া

মাটির নীচ থেকে জল তোলার কোনও লাগাম নেই। স্যালো মেশিন, মোটরের দৌলতে হু হু করে নামছে জলস্তর। গরম পড়তেই তাই জেলায় জেলায় জলসঙ্কট। যেটুকু জল পাওয়া যাচ্ছে তাতেও উঠছে বিষ। প্রকৃতির জলভাণ্ডার পুরনো অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে নিভৃতে কাজ করে চলেছেন একদল প্রান্তিক মানুষ। ভৌম জলে হাত না দিয়ে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে নদীর জল টেনে চাষাবাদ করছেন তারা।

Tanmay Mukherjee
8th May 2016
Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share

খরায় শুকোচ্ছে লাতুর। জলের দাবিতে গণ্ডগোল সামলাতে ১৪৪ ধারা পর্যন্ত জারি করতে হয়েছে। ট্রেনে করে জল পাঠিয়ে অবস্থা সামলাতে হচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের একটি রিপোর্ট ‌বলছে ২০৫০ সালে জলের জন্য হয়তো যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। লাতুর, বুন্দেলখণ্ডের জলসঙ্কট তার যেন ইঙ্গিত। এরাজ্যের অবস্থাও খুব একটা সুখকর নয়। নদীমাতৃক দেশের এই জলসঙ্কটের পিছনে বিশেষজ্ঞরা দুষছেন অবৈজ্ঞানিকভাবে জলের ব্যবহারকেই। জল সঞ্চয়ের প্রবণতা বা সচেতনতা না থাকায় ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণ কমছে আশঙ্কাজনকভাবে। মাটির নীচের জলের অপব্যবহার এর জন্য দায়ী। শীত শেষ হতে না হতেই তাই জলসঙ্কটের কবলে পড়ে রাজ্যের একাধিক জেলা। মূলত শীতকালীন চাষের জন্য বেপরোয়াভাবে যন্ত্রের মাধ্যমে জল তুলে নেওয়া হচ্ছে। এই বেলাগাম অবস্থায় রাশ টানতে বিকল্প ভাবনা প্রয়োগ করা হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং ব্লকের হাটপুকুরিয়ায়।

image


হাটপুকুরিয়ার চাষিরা জলের জন্য পিয়ালি নদীর ওপর নির্ভরশীল। সময়টা ছিল ২০১৪ সালের এপ্রিল মাস। পঞ্চায়েত থেকে ঠিক হয় সোলার প্যানেল বসিয়ে তার মাধ্যমে জল টেনে জমিতে দেওয়া হবে। এই ব্যা পারে বিশ্বব্যাাঙ্কের থেকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তায় বসানো হয় বিশালাকার সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি। জলের জোগানের জন্য পঞ্চায়েত পিয়ালি নদী সংস্কার করে। সোলারের মাধ্যমে রাস্তা, বাড়িতে আলোর কথা জানা গেলেও সোলারের সাহায্যে জলের মোটর চলবে এমন ধারণা ছিল না স্থানীয়দের। আবুল কাশেম, আব্দুর রশিদ মণ্ডল, আলাউদ্দিন মণ্ডল, হাসেম সরদার, আব্দুল আজিজ সরদাররা দ্রুত আপন করে নেন নতুন ব্যবস্থাকে। তার অনেক কারণও আছে। আবুল কাশেমের কথায়, “সামান্য কিছু মেরামতি বাদ দিলে তাদের আর খরচ নেই।” সকাল নটা নাগাদ সূর্যের তেজ বাড়লে মোটর চালানোর মতো বিদ্যুতের ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়। রোদ ঠিকঠাক থাকলে বিকেল চারটে পর্যন্ত নাগাড়ে পিয়ালি নদী থেকে জল তুলে যায় মোটর।

আব্দুর রশিদরা বলছেন, “বছর দুয়েক আগে তাদের স্যালো মেশিনের মাধ্যমে চাষ করতে মাসে বিঘা প্রতি হাজার খানেক টাকা লাগত। এখন ২০ টাকা দিলে অফুরন্ত জল।” জলের চিন্তা না থাকায় সারাবছর চাষ হয় হাটপুকুরিয়ার মোরাপিয়া রেবিসাবাদ গ্রামে। সোলারের ক্ষমতা হাসেমদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। রেবিসাবাদ গ্রামের ২০ বিঘা জমি এখন সোলারের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা বা আকাশে মেঘ দেখা দিলে খানিকটা সমস্যা। সেটা আর এবার কোথায় হল। স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ঘরামি আসল কথাটা বললেন। সিরাজুলের বক্তব্য, “কাশেমরা বুঝতে পেরেছে মাটির তলার জল বাঁচাতে পারলে সবার লাভ। তাই ওরা আর‌ কোনওভাবেই জল অপচয় করে না।” সারা বছর জল পাও‌য়ায় শসা, লঙ্কা, ঝিঙে, ঢেড়সের মতো সব্জি রমরমিয়ে হচ্ছে রেবিসাবাদ গ্রাম। কাশেমদের দেখে পাশের গ্রামের কৃষকরাও সোলারের মাধ্যমে চাষের আব্দার জুড়েছেন। সেখানেও বসেছে সোলার প্যানেল। জল যাচ্ছে ৩০ বিঘা জমিতে। খেটে-খাওয়া মানুষগুলো অন্যদের বোঝাচ্ছেন জল সঞ্চয় হলে সবাই বাঁচবে।

বছর দুয়েক আগেও এলাকার কৃষিজীবী পরিবারগুলো চাষের ভবিষ্যত নিয়ে খুবই চিন্তায় ছিলন। কারণ স্যালোতে জলই উঠত না। এখন দুশ্চিন্তা পিছনে ফেলে সকাল-সন্ধা জমিতে পড়ে থাকেন কাশেমরা। পিয়ালি নদীতে এখন সারা বছর জল থাকায় তাদের চোখগুলো উজ্জ্বল হয়েছে। বুঝতে পেরেছেন বিকল্প সেচের ব্যবস্থা তাদের অনেক দূর নিয় যাবে। সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে এদেশে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আদৌ সফল হয়নি। সেখানে প্রত্যন্ত এলাকার এই প্রতিনিধিরা বুঝিয়ে দিয়েছেন সদিচ্ছা থাকলে সব হয়।

image


Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags