সংস্করণ
Bangla

১৫ টাকায় চিকিৎসা শিবপ্রসাদের

Tanmay Mukherjee
11th Dec 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

ডাক্তারের ভিজি‌ট থেকে ওষুধপত্র সমস্ত কিছু ১৫ টাকার মধ্যে। দাঁত তুললে খরচ বাড়ে ঠিকই, তবে ২০ টাকার বেশি কখনওই না। নামমাত্র চিকিৎসার খরচে তাজ্জব করে দিচ্ছে মুকুন্দপুরের নবজনকল্যাণ সমিতি। 

image


সত্যিই অবাক কাণ্ড! এক কেজি ইলিশের দাম ১৫০০ টাকা, ৫০০ টাকার গন্ডিতে পৌঁছে গিয়েছে পাঁঠার মাংস। অগ্নিমূল্যের যুগেও এত সস্তায় চিকিৎসা ! বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে যিনি আমাকে বাস্তবের রুক্ষ্ম মাটিতে আছড়ে ফেললেন তাঁর নাম - শিবপ্রসাদ ভদ্র। বললেন, ‘‘গরিব-গুর্বো মানুষগুলোর কাছে ১৫-২০ টাকা কিন্তু কম নয়। সামর্থ্য থাকলে আমরা ওদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা করাতাম।’’

পুরনো রোয়া ওঠা ঢোলা জামা, রঙচটা প্যান্ট, মুখে লম্বা দাড়ি। নিজের প্রতি অযন্তের ছাপ স্পষ্ট। স্থানীয় মানুষজনের কথায়, পরোপকারের ভূত চেপে বসলে যে মানুষ নিজের কথাই ভুলে যায়, তাঁর প্রমাণ শিবপ্রসাদ।

আলোর নিচে অন্ধকার

সাম্রাজ্য বাড়াচ্ছে কলকাতা। বছর কুড়ি-পঁচিশ আগেও বাইপাসের ধারে মুকুন্দপুরে ছিল বাঁশ আর হোগলার জঙ্গল। সংকীর্ণ পথের দু’ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কুঁড়েঘর। আর সেখানেই কিনা আধুনিকতার জেল্লা। সুবিশাল সব হাসপাতাল। মুকুন্দপুর বনে গিয়েছে হেলথ সিটি। বিভিন্ন রাজ্য এমনকী নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ থেকে মানুষ ছুটে আসেন চিকিৎসা করাতে। হাসপাতাল তো নয় যেন তারকা খচিত হোটেল! লনের নরম ঘাসে বাহারি গাছ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আরোগ্য নিকেতনে পৌঁছলেই এগিয়ে আসে সাহায্যের হাত। আহা! যেন স্বর্গ‌।

আবারও ধাক্কা দিলেন শিবপ্রসাদ। তাঁর দাবি, নবকল্যাণ সমিতিতে যাঁরা চিকিত্সা নিতে আসেন, তাঁদের একটা বড় অংশই ওইসব হাসপাতালের নিচুতলার কর্মী। কিন্তু কেন? ‘‘ওরা কত টাকাইবা মাইনে পায়। বড় বড় হাসপাতালে বড় বড় খরচ। এত টাকা ওরা পাবে কোথায়।’’ শিবপ্রসাদের কথা শুনে মনে হচ্ছিল প্রদীপের নীচেই থাকে ঘোর অন্ধকার। সাধারণ মানুষ শুধু আলোটুকুই দেখেন।

কলেজ ছেড়ে পরোপকার

‘‘আমরা শরণার্থী পরিবার। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গিয়ে সেবার কাজে জড়িয়ে পড়েছিলাম সেই কবে। কলেজও শেষ করতে পারিনি। নেমে পড়লাম ময়দানে।’’ শিবপ্রসাদের কথায় ‘সেই থেকেই শুরু’। নিজের উপার্জন নেই। আজ জুটলেও কাল জুটবে কিনা জানা নেই। তবুও নির্বিকার। তাপ-উত্তাপ হীন। বছর পঞ্চাশের মানুষটি বলেন, ‘‘বিয়ে-থা তো করিনি। সংসারও নেই। নিজের জন্য ভাবি না। সমিতিকে নিয়ে আমি দিব্যি আছি।’’

সেটা ১৯৯৯ সাল। বিস্তর কাট-খড় পুড়িয়ে মুকুন্দপুরে মিলল জমি। কিন্তু খোলা মাঠের ওপর তো চিকিৎসা হয় না। প্রথমে টিনের চালা বেঁধে তৈরি হল ডিসপেনসারি। এরপর বহু কষ্টে দানের অর্থে তৈরি হল পাকা বাড়ি। পুরনো দিনের কথা বলতে গিয়ে শিবপ্রসাদ জানালেন চিকিৎসকদের দুয়ারে দুয়ারে তাঁকে ঘুরতে হত। বলতে হত গরিবদের চিকিত্সা করতে চাই। আপনার সাহায্য করুন। সেবার আহ্বানে সাড়া দিয়ে যাঁরা বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসা করতে রাজি হলেন তাঁদের নিয়ে তৈরি হল সমিতির কোর টিম। ঠিক হল চিকিৎসার খরচ রাখা হবে নামমাত্র। হোমিওপ্যাথ ১০ টাকা, অ্যালোপ্যাথ ১৫-২০ টাকা, ওষুধ সমেত।

কিন্তু এত কম খরচে এত কিচ্ছু হচ্ছে কী করে, ম্যাজিক নাকি। রহস্য ভাঙলেন শিবপ্রসাদ। ‘‘দরিদ্রদের চিকিত্সা পরিষেবা দিতে হলে ওষুধের কথা মাথায় রাখতেই হয়। টাকার অভাবে যদি ওরা ওষুধ কিনতে না পারে তবে তো ডাক্তার-বদ্যি করে লাভ হবে না।’’ নবজনকল্যাণ সমিতির আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিখরচায় ওষুধ দিচ্ছে সান কিংবা অ্যালকেমের মতো সংস্থা। কথা চলছে আরও অনেকের সঙ্গে।

প্রতিদিন সকাল পড়তেই দীর্ঘ লাইন। ডিসপেনসারির সামনে অসুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে প্রতীক্ষায় মা। পেশায় রিক্সাচালক সনাতন হাজরা দাঁতের ব্যাথায় গতকাল রাতে ঘুমোতে পারেননি। চোখ জবাফুলের মতো লাল। আরও কত মানুষ। কত সমস্যা। হেলথ সিটি মুকুন্দপুরে থেকেও যাঁরা বিলাসবহুল হাসপাতালে ঢুকতে পারেন না তাঁদের খানিকটা হলেও পরিষেবা দিতে পারছে নবজনকল্যাণ সমিতি। এটাই বা কম কী। রোওয়া ওঠা জামা, ঢোলা প্যান্টের শিবপ্রসাদের কথায় কিন্তু প্রত্যয়ের ছোঁয়া। বললেন সমিতির চত্বরে আমরা ধর্ম আর রাজনীতিকে ঢুকতে দিই না। তাই আমাদের অনুদান মেলে না। তবুও চেষ্টা করছি। এত দূর যখন এগোতে পেরেছি তখন বাকিটাও পড়ব।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags