সংস্করণ
Bangla

জলযোদ্ধার নাম মাসাগি

জীবন যুদ্ধে লড়াই করে দু’লক্ষ মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন আয়াপ্পা মাসাগি। শুখা জমিতে ফসল ফলিয়ে আজ তিনি সফল। বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে ফসল ফলানোর যে পদ্ধিত, এখন আয়াপ্পাকে তার জনক বলা হয়।আয়াপ্পা মাসাগি পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। জন্ম হয়েছিল উত্তর কর্নাটকের গডাগ জেলার নাগরাল গ্রামের এক গরিব পরিবারে। দু’বেলা ঠিক মতো খাবার জুটত না তাঁদের। আয়াপ্পার ছেলেবেলা কেটেছিল খুব কষ্টে। ছেলের লেখাপড়ার জন্য মা গয়না বিক্রি করে দিয়েছিলেন। আয়াপ্পা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা পাশ করেন। প্রথমে যোগ দেন বিইএমএল-এ। তারপরের চাকরিস্থল এল অ্যান্ড টি। সেখানে ২৩ বছর কাজ করেন তিনি।

Tanmay Mukherjee
24th Sep 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

আয়াপ্পার বাবা ছিলেন কৃষক। উত্তর কর্নাটকের শুখা জমিতে বৃষ্টির জল ধরে রেখে চাষের চেষ্টা করতেন তিনি। ছোটবেলার বাবাকে দেখে শিখেছিলেন কীভাবে জল সংরক্ষণ করতে হয়। আয়াপ্পা কাজে নামার পর ছোটবেলার সেই পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। ২৩ বছর চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগালেন বাস্তব জীবনে।

আয়াপ্পা স্বপ্ন দেখতেন দেশের গ্রামীণ জীবনের উন্নতির। এল অ্যান্ড টি-তে চাকরি করার সময় গডাগ জেলায় ৬ একর জমি কিনেছিলেন তিনি। মনে হয়েছিল এই শুখা জমিতে কফি, রবার চাষ করতে হবে। ভারি বর্ষায় যে ফসল নষ্ট হয়ে যায় তার চাষ করে মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে হবে। চাকরি ছেড়ে দিলেন আয়াপ্পা। শুরু করলেন শুখা জমিতে চাষ। প্রথম দু বছর ভারি বৃষ্টি হল। জমিতে ফসল ফলতে লাগল। একদিন উত্তর কর্নাটকে শুরু হল খরা। আয়াপ্পার সাধের ফসল জমিতেই শুকিয়ে গেল। ক্ষতির মুখে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর সব পরিবারে যা হয়, তাই হাল তাঁর ক্ষেত্রে। বাবা-মা প্রতিবেশী এমন‌কি স্ত্রী-ও তাঁর সমালোচনা শুরু করলেন। একটা দিন এল যখন আর সংসার চলে না। তারপর প্রকৃতির নিয়মেই এল বর্ষা। এবার জলে ডুবে গেল তাঁর ফসল। খরা আর বন্যায় দিশেহার আয়াপ্পা। ঘোর বর্ষায় তিনি নিজের বাড়ি ছেড়ে জমিতে একটা গাছে আশ্রয় তৈরি করে রাত কাটালেন। দেখলেন প্রকৃতির দু’রকম রূপ। তাঁর মনে হল খরা আর বন্যা দুটোকেই জয় করতে হবে। হাসি ফোটাতে হবে সংসারে।


image


চাকরি ছেড়ে আয়াপ্পার তখন কপর্দকশূন্য অবস্থা। তবে লক্ষ্যে অবিচল। ‘আমার তিন কন্যা আর ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতে পারছিলেন নান স্ত্রী। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর ঘরে টাকাও নেই। প্রবল সমালোচনার মুখে পড়লাম। মাথায় বুদ্ধি খেলছে কিন্তু টাকা নেই। লোকের কাছে ধার চাইতে লাগলাম। কেউ সাহায্য করলেন না।’ বললেন আয়াপ্পা। তাঁর মনে হল জল সংরক্ষণ করতেই হবে। দেখা করলেন জল বিশেষজ্ঞ আন্না হাজারে আর রাজেন্দ্র সিং-এর সঙ্গে। তারপর ‘বোর ওয়েল’ পদ্ধতির কথা মাথায় এল আয়াপ্পার।


image


‘বোর ওয়েল’ পদ্ধতির মাধ্যমে বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা সরাসরি পাঠাতে শুরু করলেন মাটির গভীরে। জলের স্বাভাবিক স্তরের সঙ্গে বৃষ্টির জল মিশে গিয়ে জলস্তর উঁচু হল। অবশেষে জল সংরক্ষণ করতে পারলেন আয়াপ্পা। খরা আর বন্যা হলেও চাষের কোনও ক্ষতি হল না। আয়াপ্পার প্রতিবেশী কৃষকরাও এই পদ্ধতিতে চাষ করতে লাগলেন। ফসল ফলতে লাগল। হাসি ফুটতে লাগল উত্তর কর্নাটকে। প্রতি বাড়িতে তখন ফূর্তির জোয়ার। টাকা এল আয়াপ্পার হাতে। ‘আমাকে সবাই ডাকতে লাগল জলযোদ্ধা বলে। একদিন তারাই আমাকে ডাকত ভাগ্যহীন ইঞ্জিনিয়ার বলে।’ আলোয় ফিরে তৃপ্তি চুঁইয়ে আসে আয়াপ্পার গলায়।


image


‘আমার বড় সাফল্য এল ডোডাবাল্লাপুরের আরদেশনাহলি গ্রামে। এলাকারই এক ‌ওষুধ তৈরি সংস্থার জলে নষ্ট হচ্ছিল ফসল। আমার বোরওয়েল পদ্ধতি সেখানে প্রয়োগ করলাম। সাফল্য এল। ওষুধের পরিত্যক্ত বিষাক্ত জলে যে ফসল নষ্ট হচ্ছিল সেই জলেই আবার ফসল ফলতে লাগল। আমার এই পদ্ধতি দেখতে এলেন জল বিশেষজ্ঞ রাজেন্দ্র সিং। ব্যস, আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টাকা এল হাতে। প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা স্কলারশিপ পেলাম। তিন বছর পর আবার স্ত্রী কন্যার মুখে হাসি ফুটল।’ বলছেন আয়াপ্পা।

আয়াপ্পার এই প্রকল্পের টাকা দিতে লাগল রেন ওয়াটার কনসেপ্ট (আর ‌ডবলু এইচ)। এগিয়ে এল ডবলু ডবলু এফ। ১৯ বছর ধরে জল সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করছেন তিনি।‌ আয়াপ্পার কথায় ‘এই ১৯ বছর কাজ করার পর আমার মনে হচ্ছে কিছু করার ইচ্ছে থাকলে এক শ্রেণির মানুষ আপনাকে টেনে ধরার চেষ্টা করবে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হবে। মাথায় যদি কিছু আসে তাহলে কোনও কিছু না ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। তারপর ভাল কিছু করলে মানুষ প্রশংসা করবে।’

রিপোর্ট বলছে এ দেশের নদ-নদী, খাল অদূর ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়বে। এর ৭০ শতাংশ জল ব্যবহার করা হচ্ছে চাষের কাজে। বোরওয়েল পদ্ধতিতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ করে চাষ করতে পারলে বাঁচবে নদী-নাল। প্রকৃতির ভারসাম্য থাকবে।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags