সংস্করণ
Bangla

খাঁকি খুলে রেস্ট নয়, টানছে এভারেস্ট

সামনে থেকে মৃত্যুকে দেখেছেন। দেখেছেন ভূমিকম্পে প্রকৃতির সংহারমূর্তি। তছনছ করে দেওয়ার প্রবল ক্ষমতা। জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই ডিঙিয়ে এভারেস্টের কাছে পৌঁছানোর পরও জয়ের স্বপ্ন তাই বুকে নিয়েই ফিরতে হয়েছিরল। সেই আক্ষেপ মেটাতে নতুন উদ্যমে আবার শৃঙ্গজয়ের উদ্দেশে পাড়ি দিচ্ছেন রুদ্রপ্রসাদ হালদার। রাজ্য পুলিশের প্রথম কোনও প্রতিনিধি হিসাবে এমন নজিরের মুখে সুন্দরবনের এই সন্তান।

Tanmay Mukherjee
2nd Apr 2016
Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share

২৫ এপ্রিল, ২০১৫। ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ১২টার দিকে ছুটছে। এরাজ্যে তখন পুরভোটের উত্তাপ। এভারেস্টের বেসক্যাম্পে সমান ব্যস্ততা। অনেক স্বপ্নের মেলা। দুনিয়া সর্বোচ্চ স্থানে যাওয়ার ইচ্ছেয় মশগুল কত মন। কেউ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারছিলেন, কেউ ট্রেকারস হাটে চটপট দুপুরের খাবার আগেভাগে খেয়ে নিচ্ছিলেন। এমন সময় ছন্দপতন। শনিবারের বারবেলার মুখে আচমকাই পায়ের তলার মাটি সরে যায় পর্বতারোহীদের। কিছু বোঝার আগেই ধেয়ে আসতে থাকে ২০-২৫ ফুট উঁচু বরফের ভয়ঙ্কর ঢেউ। মাউন্ট কুমুরি পিক থেকে আসা ওই তুষার স্রোতের ছোবল থেকে বাঁচেননি অনেকে। ২২ জনকে আছড়ে মেরে, পঞ্চাশজনের বেশি পর্বতারোহীকে অচেনা জায়গায় ফেলে দিয়ে তবেই যেন থামে প্রকৃতির রুদ্ররূপ। এই বিপর্যয়ের মধ্যেই এতটুকু না ঘাবড়ে নিজের মতো করে বাঁচার পথ খুঁজেছিলন এক বঙ্গসন্তান। নাম রুদ্রপ্রসাদ হালদার।

image


দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘির মাঝেরপাড়ার এই বাসিন্দা অনেক ত্যাগের মাধ্যমে দুনিয়ার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ জয়ের লক্ষ্যে বেরিয়েছিলেন। এভারেস্ট অভিযানের জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় ২০ লাখ টাকা। রাজ্য পুলিশের ওয়ারলেস বিভাগের এই কর্মী দফতর থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়েছিলেন। যবুকল্যাণ দফতর থেকেও পেয়েছিলেন সহযোগিতা। তবু কয়েক লক্ষ টাকা দরকার ছিল। এভারেস্ট যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর রূদ্র ধার-দেনাও করেছিলেন। ঠিকঠাকভাবে এগোনোও শুরু হয়েছিল। ১৭৬০০ ফুটে পৌঁছে স্বপ্ন এভাবেই খানখান হয়ে যায় রুদ্রর মতো পর্বতারোহীদের। এক বছর আগের সেই দিনের কথা নিয়ে রুদ্র বলেন, ‘‘আমি তখন কয়েকজনের সঙ্গে গোরখসেপে ট্রেকারস হাটে লাঞ্চ করছিলাম। সঙ্গে থাকা শেরপা বলেছিল ভাগো। হুড়মুড় করে বেরিয়ে দেখি ধেয়ে আসছে বরফ ঝড়। নাক বন্ধ করে হাত-পা ছুঁড়ে বরফের স্রোতের ওপর ভাসার চেষ্টা করলাম। একসময় হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। চার-পাঁচ মিনিট এই অবস্থা চলল। আমার সঙ্গীরা না থাকলে বিপদ হয়ে যেত।’’ এক নিশ্বাঃসে কথা গুলো বলতে বলতে রুদ্র যেন চলে যাচ্ছিলেন এভারেস্টের বেসক্যাম্পে। এরপরই রুদ্রদের কানে আসতে একের পর এক পর্বতারোহীর প্রাণহানির ঘটনার কথা। চোখের সামনে মৃত্যু দেখেও রুদ্ররা পিছু হটেননি। অনেকেই ফিরে আসার কথা বলেছিলেন। এত দিনের স্বপ্ন এভাবে ফেলে আসতে চাননি রুদ্ররা। কারণ এত টাকা খরচের পর নেপাল সরকার নতুন করে অভিযানে টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে টালবাহানা করছিল। ভাঙা মন নিয়ে ফেরার পর নেপাল সরকার ফের টাকা দেওয়ার কথা বললে হারানো সুর যেন খুঁজে পান রুদ্র। ফের এভারেস্ট স্বপ্ন মাথাচাড়া দেয়। শুরু হয় নতুন উদ্যমে নেমে পড়া। নিজের দফতর থেকে সবরকম সাহায্য পেয়েছেন। আর তাই পিছনে তাকাতে চান না রাজ্য পুলিশের এই কর্মী। আগামী ৭ এপ্রিল স্বপ্নপূরণের উদ্দেশে রওনা দেবেন। এবার তাঁর এই সফরের সঙ্গী তিনজন।

পর্বতারোহী

ভূবিজ্ঞানীদের মতে হিমালয় দোলার মতো। যখন তখন কাঁপতে পারে। ২৫ এপ্রিলের কম্পনে রিখটার স্কেলের মাত্রা ছিল ৭.৮। এই কাঁপুনিতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল নেপাল। এখনও পাহাড়ি দেশ গুছিয়ে উঠতে পারেনি। তবুও ঘুরে দাড়ানোর সবরকম চেষ্টা রয়েছে তাদের। সেই লড়াইয়ের মতো আবার এভারেস্টে যাচ্ছেন রুদ্ররা। তিন বছরের মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে সোনারপুরে ভাড়াবাড়়িতে থাকেন রুদ্র। গতবার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার পর এবার ‌কীভাবে স্বামীর সিদ্ধান্তে একমত হলেন। রুদ্রর সহধর্মিণী রীতা রক্ষিত বলেন, ‘‘ওকে প্রথম থেকেই এভাবে দেখছি। শুরুর দিকে একটু ভয়ে পেলেও এখন হয় না। পরিবার ওর পাশে আছে।’’ পাশে থাকার বার্তা রুদ্রর ক্লাব আরোহীর। এই ক্লাবে থেকেই রুদ্রর পাহাড় প্রেম। ক্লাবের সদস্যদরাও মনে করেন এবার হবেই।

৭ এপ্রিল সকালে দমদম থেকে কাঠমুণ্ডুর উদ্দেশে রওনা দেবেন রুদ্র। কাঠমান্ডুতে তিন-চার দিন থেকে পারমিট রিনিউ, যন্ত্রপাতি‌ গোছানোর মতো কিছু জরুরি কাজ সেরা নেওয়া। ১০-১১ তারিখ নাগাদ কাঠমান্ডু থেকে তিরিশ মিনিটের প্লেন লুখলায় যাবেন রুদ্ররা। সেখান থেকে কয়েক দিন হেঁটে বেস ক্যাম্পেে পৌঁছানো। সেখানে বেশি উচ্চতায় ওঠা-নামার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। দশ পনোরো দিনে এভাবে অনুশীলনের পর ফাইনাল ক্লাইমিং শুরু হবে এপ্রিলের শেষের দিকে। সবকিছু ঠিকঠাক চললে মে মাসের শেষের দিকে এভারেস্টের দিকে এগোবেন রুদ্ররা। সব ভাল হলে ৫-৬ জুন হবে মাহেন্দ্রক্ষণ। এখন থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ যেন দেখতে পাচ্ছেন রুদ্র। প্রক‌তির রুদ্রমূর্তি দেখার পর বাস্তবের রুদ্র তাই অনেক পোড়খাওয়া। তাকে যে জিততেই হবে।

image


Add to
Shares
1
Comments
Share This
Add to
Shares
1
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags