সংস্করণ
Bangla

'অ্যাগ্রো স্টার্ট-আপ' কি ভারতীয় কৃষকদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারবে?

YS Bengali
20th Nov 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

'খারাপ ফলন : ঋণ শোধ করতে না পেরে কৃষকের আত্মহত্যা' - গত এক বছরে দেশ জুড়ে বাড়তে থাকা কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা এভাবেই বারবার উঠে এসেছে খবরের শিরোনামে। National Crime Records Bureau (NCRB)-র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ৫,৬৫৭ জন চাষী আত্মহত্যা করেছেন। এবছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র মহারাষ্ট্রেই ২,০১৬ জন কৃষক আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। গত পাঁচ বছরে যা সর্বাধিক। ওড়িশা, গুজরাট, উত্তর প্রদেশ, কর্ণাটক, পঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়-এর মতো রাজ্যেও একই ধরণের ঘটনার সংখ্যা কম নয়।

image


অত্যধিক দেনা ও ঋণ শোধ করতে না পারা, পারিবারিক বিবাদ এবং কৃষিকাজে সমস্যা - প্রত্যেকটি আত্মহত্যার ঘটনায় এই তিনটিই ছিল মূল কারণ। 

গোটা দেশে যে ঘটনার সংখ্যা শুধুমাত্র ২০১৪ সালেই ছিল ৩,২৬৭। 'রিলিফ প্যাকেজ', ২০০৬; Agricultural debt Waiver and Debt Relief Scheme, ২০০৮; 'মানি লেন্ডিং (রেগুলেশন) অ্যাক্ট', ২০০৮; 'মহারাষ্ট্র রিলিফ প্যাকেজ' ২০১০; Kerala Farmers’ Debt Relief Commission (Amendment) Bill,২০১২ - কৃষকদের উপর থেকে ঋণের বোঝা কমাতে রাজ্য এবং কেন্দ্র, দুই সরকারের পক্ষ থেকেই এরকম বেশ কয়েকটি প্রকল্প চালু করা হয়। যদিও আদতে এর কোনওটিই এবং সরকারের কোনও চেষ্টাই সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগগুলির প্রত্যেকটিরই লক্ষ্য ছিল ঋণ এবং ধার: উপার্জন, উৎপাদন এবং কৃষকদের উন্নয়নের বিষয়টি নজরেই আসেনি সরকারের। এর ফলে কৃষকরা ঋণ শোধ করতে পেরেছিলেন। এর সুদের হার মহাজনদের সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু গরীব চাষীদের রোজগারের পথ বা পরিমাণ কোনওটাই বৃদ্ধি পায়নি। ফলস্বরূপ, একদিকে এখনও মহাজনদের কাছে ২৪ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা; অন্যদিকে জমির ক্রমহ্রাসমান উৎপাদক্ষমতা এবং খারাপ আবহাওয়া বাদ সাধছে ফসল উৎপাদনে।

আবহাওয়ার উপর আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সরকারি উদ্যোগ (রিলিফ প্যাকেজ এবং সংশোধনী বিল) কৃষকদের খুব সামান্যই কাজে লেগেছে। এই অবস্থায় কৃষকদের জন্য আদৌ কি কোনও সমাধানের পথ খোলা আছে? কৃষিক্ষেত্রে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্টার্ট-আপ কি তাদের দূরবস্থা ঘোচাতে পারবে?

প্রধান সমস্যা এবং সমাধান

"এদেশের কৃষকরা মূলত যে দুটি সমস্যার সম্মুখীন হন তা হল উৎপাদন এবং বন্টন," বলছেন Aspada-র সহ সভাপতি, সাহিল কিনি। Aspada Investment একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল যারা এমন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে যার সামাজিক প্রভাব রয়েছে। তিনি আরও বলেন 'অ্যাগ্রো স্টার্ট আপ' গুলি কৃষিক্ষেত্রের বৃহত্তর সমস্যা যেমন, উপার্জন, উৎপাদন এবং কৃষকদের অবস্থার উন্নয়নের চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে।

তাঁর মতে উৎপাদনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে ভারতে উৎপাদনের মাত্রার একটা বিশাল ফারাক অর্থাৎ “yield gap” রয়েছে।

এই বৈষম্যের একটা বড় কারণ এদেশের জমি প্রস্তুতির সময় নিম্নমানের বীজ এবং সারের ব্যবহার। সেই সঙ্গে কৃষিকাজের জন্য কৃষকদের যে উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, তার ব্যবস্থাও এখানে নেই। তার উপর ছোট খামারগুলিতে অর্থের যোগান না থাকায় অত্যাধুনিক মানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করাও একপ্রকার অসম্ভব। ‌

শস্য ফলন থেকে তা বাজারে পৌঁছনো পর্যন্ত অন্তত ছয়টি ধাপ রয়েছে এবং প্রতিক্ষেত্রেই পরিকাঠামোগত অভাবজনিত কারণে উৎপাদিত বস্তুর গুণমান কমতে থাকে। ফলে মানের দিক থেকে আন্তর্জতিক বাজারে যে দ্রব্য বিক্রি হয় তার সঙ্গে এদেশের বাজারের দ্রব্যের অনেকখানি তফাত গড়ে ওঠে। এর পাশাপাশি এখানে প্রতিক্ষেত্রেই ফড়ে বা দালালদের সমস্যা রয়েছে। কৃষকের উৎপাদিত শস্য বাজারে পৌঁছনো পর্যন্ত মিডলম্যানের সংখ্যা প্রচুর। ফলে কৃষকের লাভের অংকও কম।

পরিবহনের সময় বারবার এক যান থেকে আর এক যানে শস্য স্থানান্তরের সময়ে অন্তত ৪০শতাংশ পড়ে গিয়ে নষ্ট হয়। নষ্ট হয়ে যাওয়া জিনিসের পরিমাণ এতটা বেশি হওয়ার একটা বড় কারণ ঠাণ্ডা ট্রাকের অভাব। এদেশে মাত্র ৮,০০০ রেফ্রিজারেটেড ট্রাক রয়েছে, যার সাহায্যে তাজা সবজি পরিবহন করা যায়। ফলে বছরে মোট উৎপাদিত ১০ কোটি ৪০ লক্ষ টন সবজি এবং শস্যের মধ্যে কেবলমাত্র ৪০ লক্ষ টন সবজি তাজা অবস্থায় বাজারে পৌঁছয়।

অর্থাৎ জমির রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং খেত থেকে বাজার পর্যন্ত সাপ্লাই চেন - এই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।

আমাদের দেশের জলবায়ু এবং মাটির প্রকৃতিতে বৈচিত্র্য এতটাই যে এখানে প্রায় সবরকমের শস্য, ফল এবং সবজির উৎপাদন সম্ভব। যা গোটা বিশ্বে খুব কমসংখ্যক দেশেই হয়ে থাকে। তা সত্ত্বেও অন্যান্য দেশের চেয়ে এখানকার খেতে উৎপাদনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ছোট জমিতে চাষ এর একটা বড় কারণ। এদেশে একটি সাধারন ফার্মের আয়তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনও ফার্মের আয়তনের ১০০ ভাগের ১ ভাগ মাত্র।

"ঋণে জর্জরিত চাষীদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারলেই অনেকখানি সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমরা উচ্চমানের এবং অধিক পরিমাণে ফসল উৎপাদন করতে পারলেই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ অনেকখানি হ্রাস পাবে," বলছেন EM3 Agriservices এর সহ প্রতিষ্ঠাতা এবং সিওও, অদ্বিতীয় মাল। এই সংস্থা যেকোনও ফার্মে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং সেই সংক্রান্ত সমস্ত পরিষেবা প্রদান করে। 'Pay for use' পদ্ধতিতে, ছোট চাষীদের কাছে প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার কাজ করে থাকে তারা।

ভারতের মতো দেশ, যেখানে মূলত 'small farm'এই উৎপাদন হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কৃষকেরা উন্নতমানের যন্ত্রপাতি কিনতে সক্ষম নন, সেখানে এধরণের সহায়ক প্রকল্প নিঃসন্দেহে কৃষকদের উন্নয়নে সহায়তা করবে।

অদ্বিতীয় এই pay-for-use on-farm পরিষেবা মডেলের নাম দিয়েছেন Farming-as-a-Service (FaaS)। জমির প্রস্তুতি থেকে শুরু করে শস্য উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই তিনি প্রযুক্তিগত পরিষেবা প্রদান করেন। এছাড়া, কৃষকদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নেও বড় ভূমিকা পালন করতে পারে EM3 Agriservices। কীভাবে? তা জানতে চাওয়ায় অদ্বিতীয় বললেন, "সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে। আমরা কোনও ফার্ম সম্পর্কে সব তথ্য জোগাড় করে তা ব্যাঙ্কে জমা দিই। যার ফলে ব্যাঙ্ক থেকে লোন পাওয়া কৃষকদের পক্ষে সহজ হয়।"

"আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে বন্টন এবং পরিসরই মূল বিষয়। এই জায়গাটা ঠিক করতে পারলে সঠিক এব উপযুক্ত প্রোডাক্ট উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে। উৎপাদিত দ্রব্য যাতে সঠিক এবং আরও বৃহৎ পরিসরে পৌঁছতে পারে তার জন্য আমরা প্রচুর তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি যা যা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সব করার চেষ্টা করছি। সঠিক তথ্য এবং প্রশিক্ষণই কৃষিজ দ্রব্য উৎপাদন এবং কৃষকদের আর্থিক উন্নয়নে সবচেয়ে বড় সহায়ক হয়ে উঠতে পারে," জানালেন অদ্বিতীয়।

 

লেখা : তৌসিফ আলম; অনুবাদ : বিদিশা ব্যানার্জী

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags