সংস্করণ
Bangla

গ্রামের ফরিস্তারাই বাসুদেবপুরে জ্বালবেন শিক্ষার আলো

Hindol Goswami
8th Dec 2017
46+ Shares
  • Share Icon
  • Facebook Icon
  • Twitter Icon
  • LinkedIn Icon
  • Reddit Icon
  • WhatsApp Icon
Share on

গ্রামের নাম বাসুদেবপুর। হাওড়ার উলুবেড়িয়া থেকে মিনিট দশেক গেলেই পাবেন এই আঙুর ছড়ার মত সাজানো বসতির একটি থোকা। হিন্দু পাড়া, শনি মন্দির, দুর্গা পুজোর পুরনো দেউলটি পেরিয়ে যেতে যেতেই আজানের ডাক শুনতে পাবেন। আর একটু এগোলে বাসুদেবপুরের মুসলিম পাড়া। পথের পাশে মসজিদ, দরগা-তলা, কেরাত শেখার মাদ্রাসা, সবুজে সবুজ পাড়াটায় খেত খামার একেবারে নেই তা নয়, তবে অধিকাংশ পরিবারই এখানে জরির কাজ করে টিকে আছে। রোগা শীর্ণ ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলো পড়াশুনো- খেলা ধুলো হুটোপুটির পর বাবা মায়েদের জরির কাজে সাহায্য করে। একটা সময় ছিল কিশোর কিশোরীদের অধিকাংশই লেখা পড়া ছেড়ে জরির কাজে লেগে পড়ত। জরির কাজ মাত্র মাস ছয়েকের জন্য থাকে। বাকি বছরটা আগের রোজগারের টাকায় চলে। তাও সেই কাজেই লেগে পড়তে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হত ছেলেমেয়েগুলো। এভাবেই চলছিল। কিন্তু গ্রামের মানুষের এই দিনগত পাপক্ষয়ের বাঁধাগৎ বদলে দেওয়ার চেষ্টা করলেন গ্রামেরই একদল যুবক। আজকের কাহিনির নায়ক এই যুবক দল।

image


ওরা সংখ্যায় জনা পাঁচেক। শেখ হাসিবুর রহমান, শেখ আরিফ, কাজী কিরমানী, ওয়াসিম পারভেজ আর আসমাউল বেগ। সকলেই এই গ্রামেরই ছেলে। কিরমানী দুবাইয়ে চাকরি করেন। হাসিবুর লেখা পড়া শিখেছেন, ছোটবেলায় পড়ার ফাঁকে জরির কাজ করেছেন। দারিদ্রের জ্বালা টের পেয়েছেন ছোটবেলা থেকেই। এখন মানুষের মত মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখেন এই যুবক। চাকরি করেন পেপসি সংস্থার ফুড প্রসেসিং ইউনিটে। শেখ আরিফ গ্রামের ছেলে। লেখাপড়ায় ভালো। শিক্ষকতা করেন। ওয়াসিম পারভেজ অনেক কষ্ট করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। পারিবারিক নানান প্রতিবন্ধকতাকে পরাস্ত করে জীবন যুদ্ধে সাহসী সৈনিকের মতো এই যুবক এখন একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন। আর দলের সব থেকে কনিষ্ঠটি আসমাউল বেগ। বয়স সবে কুড়ির কোঠায়। এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন। স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে পার হওয়া এই যুবকেরাই এলাকার মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। ২০১২ সালে শুরু হয়ে এঁদের কর্মকাণ্ড।

প্রথমে একটা কোচিং স্কুল। স্কুলের পর পড়াশুনো করার একটা মুক্তাঙ্গন তৈরি করেন ওরা। তারপর শুরু হয় একের পর এক সামাজিক কাজ। মানুষ গড়ার মিশন চলতে থাকে। দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর পেরিয়ে এলেন ওঁরা। এখন এলাকার গরিব ঘরের স্কুল ছুট ছেলেমেয়েদের জন্যে ছেলেমেয়েদের জন্যে একটি সমান্তরাল স্কুল খুলেছেন। তাঁদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। আর যাদের ক্ষমতা আছে কেবল তাদের কাছ থেকেই যৎ সামান্য টিউশন ফি নিয়ে চলছে মানুষ গড়ার কারখানা। সমাজসেবা মূলক এই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয়েছে হিউম্যান অ্যালায়েন্স কালচারাল ওয়েল ফেয়ার সোসাইটি। এই পাঁচ বছরে এলাকার মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা কুড়িয়েছে এই সংস্থা। বেড়েছে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা। কিরমানী দুবাই থেকে যখন যেমন পেরেছেন গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্যে অর্থ পাঠিয়েছেন, বাকি সদস্যরাও নিজেদের উপার্জনের টাকা উপুড় করে দিয়েছেন। গ্রামের মানুষের কাছে প্রয়োজনে হাত পেতেছেন ওঁরা। কখনও হতাশ হননি। একটু একটু করে সেজে উঠেছে HAK -এর উদ্যোগ। গড়ে উঠেছে লেখাপড়ার একটি নির্দিষ্ট পরিকাঠামো। আধুনিক কম্পিউটার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুধু পড়াশুনো নয়, পড়াশুনোর পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন সচেতনতার কাজও করে চলেছে এই সংস্থা। যেমন ধরুন এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্যে মাইক্রো ফাইনান্সের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প চালু করার কাজ। হাতের কাজ শিখিয়ে গ্রামের মানুষকে আরও দক্ষ কর্মী হিসেবে তৈরি করার কাজ। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের মধ্যে ঔদার্য বিকাশের কাজ। সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করে এলাকার মানুষকে সুস্থ জীবনে উত্তীর্ণ করার কাজ করে চলেছে HAK Welfare Society নামের এই সংস্থা।

এই পথে আলো জ্বেলেই যে বাসুদেবপুরের ক্রমমুক্তি হবে সে ব্যাপারে শেখ হাসিবুর রহমান বেশ আত্মবিশ্বাসী। বলছিলেন, এখন ওদের চাই আরও মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ। ফেসবুক এবং সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করেই শুভানুধ্যায়ীদের কাছে পৌঁছতে চান ওরা। পাশাপাশি ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে রেস্ত তোলার কথাও ভাবছেন, যা দিয়ে এলাকার সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।

46+ Shares
  • Share Icon
  • Facebook Icon
  • Twitter Icon
  • LinkedIn Icon
  • Reddit Icon
  • WhatsApp Icon
Share on
Report an issue
Authors

Related Tags