সংস্করণ
Bangla

অনলাইন বিক্রিতে জোর দিতে কৌশল বদল করছে ByLoom

Hindol Goswami
8th Jun 2017
Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share

অনলাইন বাজারের সঙ্গে তাল মেলাতে অনলাইন মার্কেটিংয়ের ওপরেই আরও বেশি করে মনোনিবেশ করছে কর্তৃপক্ষ। দেখতে দেখতে সফল সাতটি বছর পেরিয়ে এসেছে এই সংস্থা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কলকাতাতেই দুটি দোকানের প্রয়োজনীয়তা নেই। হিন্দুস্তান পার্কের দোকান চলবে কিন্তু সল্টলেকের শোরুম বন্ধ করে বরং অনলাইনে বিক্রির ওপর বিশেষ মনোনিবেশ করতে চলেছে বাইলুম। স্টার্টআপ বলতে যা বোঝায় আক্ষরিক অর্থে তেমন স্টার্টআপ নয় মালবিকা বন্দ্যোপাধ্যায়দের এই বাইলুম। বছর দুয়েক হল ওয়েবসাইটের মারফত বিক্রি করা শুরু করেছেন ওরা। ভার্চুয়াল স্টোরের মারফত ডালাস থেকে ঢাকা, চেন্নাই অথবা চণ্ডীগড় সব জায়গায় ওদের মারফত পৌঁছে যাচ্ছে ভারতীয় হ্যান্ডলুম। প্রতিযোগিতা যে একদম নেই তা কিন্তু নয়। তবু ওদের কারিগরদের কাজ, ডিজাইন, বুননের ফ্যান ফলোয়ার দারুণ। ‘হিলারি ক্লিনটন থেকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, অপর্ণা সেন, মুনমুন সেন, লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমার, ঋতুপর্ণ ঘোষ, কিরণ খের থেকে সুনন্দা পুষ্কর-বাইলুমের ফ্যানের তালিকাটা রীতিমতো ইর্ষণীয়’বলছিলেন আর হাসছিলেন মালবিকা।

image


সেদিক থেকে দেখতে গেলে অতি অল্প সময়েই সাফল্য পেয়েছে এই বিপণী। কিন্তু সময়ের দাবি মেনে ওয়েবসাইটের মারফত বিক্রির ব্যাপারেই আরও বেশি মনোনিবেশ করা হবে বলে জানালেন মালবিকা। যে চারজন এই সংস্থার মূল কর্ণধার তাদের একজন মালবিকা। বলছিলেন বছর সাতেক আগে যখন শুরু হয়েছিল তখন আর এখনের মধ্যে ব্যবসায়িক দিক থেকে অনেক হেরফের হয়েছে। হিন্দুস্তান পার্কের পর এক সময় সল্টলেকেও শোরুম খোলাটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছিল। কিন্তু অনলাইন বাজারে রমরমাই ওদের চোখ খুলে দিয়েছে। তাই একটু একটু করে গুরুত্ব পেয়েছে ওদের ডিজিটাল স্টোর। বাইলুমের ওয়েবসাইটে গেলে আপনি পাবেন ভারতীয় বয়ন শিল্পের বিপুল সম্ভার। মূলত শাড়ির জন্যেই বিখ্যাত বাইলুম। হরেক কিসিমের শাড়ি পাওয়া যায়। বিশ্বের ফ্যাশন ট্রেন্ডে মাটির গন্ধ লেগে থাকা হস্তশিল্পকে পরিচিতি দিয়েছে এই সংস্থা। এই উদ্যোগের পেছনে মালবিকা ছাড়া আছেন তাঁর স্বামী জিৎ, বাপ্পাদিত্য বিশ্বাস এবং তাঁর স্ত্রী রুমি। চারজনের এই উদ্যোগ ২০১১ র এপ্রিলে শুরু হয়েছিল। হিন্দুস্তান পার্কে একটি দোকান দিয়ে। শুরু থেকেই নজর কেড়েছে।

শুরু থেকেই নারীর সত্যিকার সৌন্দর্যকে কুর্নিশ করেছে বাইলুম। ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপনে শিখিয়ে দেওয়া নারীর সংজ্ঞা নয়, বাইলুম বিশ্বাস করে যা স্বাভাবিক তাইই চিরায়ত সুন্দর। সেই সৌন্দর্যকেই সেলিব্রেট করে বাইলুম। তাই ব়্যাম্পের মডেলরা বাইলুমের মডেল নন। সাধারণ ঘরের ঘরোয়া মা মেয়ে, জীবনের প্রাঙ্গণে লড়াই করা নারীই তাঁদের মডেল।

হাতে বোনা শাড়ি। দেশজ সামগ্রীর বিপণি হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করে এই সংস্থা। আজ থেকে বছর সাতেক আগে এই উদ্যোগটি যখন শুরু হয় তখন এটি এমন একটি বৈপ্লবিক চরিত্রের ছিল যে পরে ওদের দেখে অনেক স্টার্টআপই ভারতীয় তাঁত নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছে। ওদের লক্ষ্য ছিল হ্যান্ডলুমে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতাকে মিশিয়ে দেওয়া, বলছিলেন বাপ্পাদিত্য। বাইলুমের সব ডিজাইনে যার হাতের ছোঁয়া অনস্বীকার্য।

দক্ষিণ কলকাতায় বাইলুমের শোরুমে উজ্জ্বল রঙ আর পুরনো দিনের ডিজাইনে আসবাব, আধুনিকতার মিশেলে ঐতিহ্যের টান। সাজানো গোছানো আরামদায়ক অথচ শোরুমগুলিতে বিলাসিতার ছাপ। বাপ্পাদিত্য বলছিলেন, এতে আমাদের ইচ্ছাপূরণ হয়েছে, আসলে আমরা যে যাই করতে চাই তা করতে পারার জায়গা হিসেবে বাইলুম খুলেছিলাম আমরা। এই বাইলুমের মাধ্যমে আমরা চেয়েছি গাঁয়ে গঞ্জে নজরে না আসা শিল্পীদের স্বনির্ভর করে তুলতে। মার্কেট স্টাডি করে আমরা জানি কিসের কাটতি বেশি। সেই মতো শিল্পীদের ডিজাইন দিয়ে দিই, যাতে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে নিজেদেরও সময়োপযোগী করে ফেলতে পারেন তাঁরা, কীভাবে কাজ করে বাইলুম বোঝাচ্ছিলেন বাপ্পাদিত্য।

কটন, সিল্ক, তসর, লিনেন- সব হ্যান্ডলুমের শাড়ি। প্রত্যেকটা শাড়ি এক্সক্লুসিভ। এক একটার এক একরকম চরিত্র, নামও ভিন্ন। আবির শাড়ি- যেমন নাম তেমনি রঙের হোলি খেলা জমি জুড়ে। শিবোরি সিল্ক, ডিস্কো খাদি, মাস্কারা শাড়ি আরও কত কী। দামও নানা রেঞ্জের, সাড়ে সাতশো থেকে ১৫,০০০ টাকা বা তারও বেশি, যার যেমন সামর্থ্য, সব ধরনের ক্রেতার সাধ্যের মধ্যে রাখা হয়েছে শাড়ির দাম।

বাইলুমের একটা বড় অংশ যদিও শাড়ি। তাছাড়া, দোপাট্টা, ব্লাউজ, অ্যাক্সেসরিজ মানে দুল, হাতের, গলার গয়না, নাকছাবি, টেক্সটাইল জুয়েলারি, কুর্তা, ব্যাগ, জুতো, ফ্যন্সি ধুতি কী নেই। সবই তস্য গ্রামের শিল্পীদের হাতে তৈরি। বাইলুমের মাধ্যমে দেশে এমনকি বিদেশের বাজারেও সমাদৃত হয় সেই সব। পোশাক-আশাক ছাড়াও ঘর সাজানোর খুঁটিনাটি জিনিসপত্র, ফুল কাটা কাঁথা, কুশন কভার, হাতে তৈরি টাওয়েল, গামছা, ন্যাপকিন, ব্যাগ-বটুয়া, শান্তিনিকেতনি স্টাইলে চামড়ার ব্যাগ, ঘরে তৈরি সাবান, ত্বকের যত্নে প্রাকৃতিক প্যাক, চুলের যত্নে নানা হারবাল প্রোডাক্ট, বিয়ার মাগ, টি-কফি সেট, নোটবুক, ব়্যাপিং পেপার এতসব কিছু পাওয়া যায় বাইলুমে।

নিজেদের প্রোডাক্ট ছাড়াও রাজ্যের এবং রাজ্যের বাইরে এমনকি বিদেশে তৈরি নানা জিনিসপত্রের চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত মালবিকাদের এই সংস্থা। অর্থাৎ বাঙালি কাঁথা থেকে রাজস্থানি উটের চামড়ার ব্যাগ, নাগাল্যান্ডের রান্নার বাসন অথবা কেনিয়ার জুতো পাওয়া যাবে হাতের কাছেই। টিম বাইলুমের একঘেয়েমি এক্কেবারে না-পসন্দ। দোকান খুলে বসে থাকায় বিশ্বাস করে না। তাই বছরভর শোরুমেই নানা ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন হয়। বাইরের রাজ্যে এবং বিভিন্ন শহরে হয় প্রদর্শনী। উদ্দেশ্য নতুন নতুন প্রোডাক্টগুলির সঙ্গে ক্রেতাদের পরিচয় ঘটানো।

বাইলুমের আরেকটি আকর্ষণ বাইলুম ক্যান্টিন। কেনাকাটার পর ক্যান্টিনে ঢুঁ না মারলে অনেককিছু মিস হয়ে যেতে পারে। রেস্তোরাঁর মোটা বিল ভুলে যান, হাতে শপিং ব্যাগ বয়ে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন ক্রেতারা তখন সস্তার ক্যান্টিনে চলে যেতে পারেন। ঘরোয়া পরিবেশে রিল্যাক্স করুন। বাহারি বেঞ্চ, সঙ্গে টেবিল, মাথার ওপরে হাতের কাজের ঝালরের ছাদ-সবটাই বাপ্পাদিত্যর ডিজাইন করা। মনোরম পরিবেশে একটু জিরিয়ে অর্ডার করুন লুচি ধোঁকার ডালনা, নিরামিষ পছন্দ না হলে চিন্তা নেই। আছে ফিশরোল, লুচি কসা মাংস অথবা মাংসের চপ। চাইলে চিকেন মোমো, পিটা পকেট অথবা কাস্টার্ড। গলা ভেজাতে নারকোলের জলে লেবু আর মধু মেশানো, বুক জুড়িয়ে যাবে।

‘বাংলার রূপ, গ্রামে পড়ে থাকা শিল্পীদের সারা বিশ্বে পরিচিতি দেওয়া জরুরি। বাইরের দেশগুলি তাদের ব্র্যান্ড, ডিজাইন, স্টাইল ভারতে জনপ্রিয় করে তুলছে। এই প্রবণতা বেশ ভালো। কিন্তু একইসঙ্গে একইভাবে ভারতের, বাংলার ঐতিহ্যগুলিকেও আমরা বিশ্বে পরিচিত করে তুলতে পারি। বাঙালিয়ানা ছেড়ে যারা পাশ্চাত্যের পোশাকে ঝুঁকেছেন তাঁদের বলে রাখি গ্রামের শিল্পীদের হাতে বোনা এই সব শাড়ি আপনাকে যেকোনও পার্টিতে স্টাইলিশ করে তুলবে। সে দায়িত্ব সানন্দে কাঁধে তুলে নিয়েছে বাইলুম।

Add to
Shares
3
Comments
Share This
Add to
Shares
3
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags