সংস্করণ
Bangla

গাছতলা থেকে শিক্ষাঙ্গন : আলো জ্বালছেন অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী বাবিদা

Tanmay Mukherjee
6th Feb 2016
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

আইসিডিএস সেন্টারের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রায় আকাশ থেকে পড়ার জোগাড়। দুধের শিশুদের নাকি পড়াতে হবে গাছতলায়। রোদ, বৃষ্টি হলে একরত্তি বাচ্চাদের কী হবে। এই প্রশ্ন তুলে একসময় উর্ধ্বতনের থেকে দেখছি, দেখবর বাইরে আর কিছুই পাননি বাবিদা খাতুন। নিজের তিন শতক জমি দিয়ে একাই এগিয়ে এসেছিলেন ওই অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। সেই জমিতেই মাথা তুলে দাঁড়াল স্কুল। আবার পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি হল বীরভূমের নলহাটির সংখ্যালঘু প্রভাবিত নোয়াপাড়া মালপাড়া এলাকায়। বাবিদার লড়াই দেখে একসময় যারা চোখ বন্ধ করে ছিলেন তারাও সেন্টারের উন্নতির জন্য সবরকম সহযোগিতা করলেন। যার সুবাদে দেশের লক্ষাধিক অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর মধ্যে সেরা একশোয় জায়গা পেয়েছেন বীরভূমের অজ গাঁয়ের এই যোদ্ধা।


image


মাদার্স মিটিং। সেটা আবার কী! দিদিমণির কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? সংসার ঠেলতেই দিন কাবাড়, তারপর আবার ‘খিচুড়ির’ স্কুলে যেতে হবে। বিরক্তি নিয়ে যে সব বধূরা পর্দা সরিয়ে কয়েক বছর আগে গ্রামের আইসিডিএস সেন্টারে গিয়েছিলেন তাদের চোখে এখন খুশির ঝিলিক। সন্তানদের নিয়ে কত রঙিন স্বপ্ন। তারা জানেন তিন বছর হলেই স্কুল পাঠানোর অভ্যাস করাতে হবে। পড়াশোনা না করলে জীবনের ষোলো আনাই ফাঁকি। আর তাই স্রেফ খিচুড়ি বা খাবারের জন্য অঙ্গনওয়াড়িতে জীবনের প্রাথমিক পাঠ শিখতে যায় না শাহানাজ বেগম, শিউলি খাতুন, গৌরী মাল, শীলা মালরা। দিন বদলের এই কাহিনির পিছনে একজনই। বাবিদা খাতুন। বীরভূমের নলহাটির নোয়াপাড়া মালপাড়ার এই বাসিন্দা অনেক ত্যাগের বিনিময়ে প্রাণের চেয়ে প্রিয় এই সেন্টারকে এই জায়গায় তুলে এনেছেন।


image



নোয়াপাড়া মালপাড়া অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। কয়েক বছর আগেও এর উপস্থিতি কোথায় ছিল অনেকেই তা বলতে পারতেন না। পাঠদানোর ব্যবস্থা ছিল গাছতলায়। যেখানে পড়াশোনা একেবারেই অনিয়মিত হত। সংখ্যালঘু এবং পিছিয়ে পড়া এলাকার ছবির সঙ্গে যেন মানানসই ছিল মালাপাড়ার এই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রটি। নুন আনতে পান্তা ফুরনোর সংসারগুলিতে তাই এই আইএসডিএস কেন্দ্রটি ‘খিচুড়ির’ স্কুলে বাইরে আর কোনও পরিচয় পায়নি। পড়াশোনা নয়, খিচুড়ির সময় হলেই যত শিশু ও তাদের অভিভাবকদের আনাগোনা থাকত। পাঁচুন্দি থেকে যখন নিজের গ্রামের এই সেন্টারের দায়িত্ব আসেন বাবিদা খাতুন, তখন গড্ডালিকায় প্রবাহে কার্যত হারিয়ে যায় এই কেন্দ্রের সব কিছুই। ঝাঁকুনিটা দিতে গিয়ে বাবিদা বুঝতে পারেন যা করার নিজেকেই করতে হবে। ছেলেমেয়েদের মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে দিতে গিয়ে অনেক তদ্বির করেছিলেন। তেমন কিছু না হওয়ায় নিজের তিন শতক জমি আইএসডিএস সেন্টারের বাড়ি বানানোর জন্য দেন। নিজে চার পা এগোনোর পর প্রশাসনও এগিয়ে আসে। ভবন তৈরি হওয়ার পর অভিভাবকদের বোঝানো শুরু করেন বাবিদা। খিচুড়ি, সকালের টিফিনের বাইরেও যে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র হতে পারে সেই বিশ্বাসটা ধীরে ধীরে তৈরি করেন তিনি। এর ফলে ১১০ জন পড়ুয়াকে নিয়ে তাঁর এখন বিশাল ‘সংসার’। শিউল, গৌরীরা বুঝে গিয়েছে ঠিক সময়ে স্কুলে ঢুকতে হয়। জুতো গুছিয়ে রাখতে হয়। নখ থাকলে কী সমস্যা হতে পারে তা এখন রীতিমতো বড়দের শেখায় এই শিশুরা। নেতাজি জয়ন্তী, প্রজাতন্ত্র দিবসে নানারকম বিষয় নিয়ে বলতেও পারে তারা। মায়েরা প্রতি মাসে নিয়ম করে একবার করে এসে বাবিদা দিদিমণির সঙ্গে মত বিনিময় করেন। শুধু সন্তানদের ভাল-মন্দ নয়, নিজেদের ব্যাপারে অনেক ধরণের পরামর্শ পান।


image


বছর ছত্রিশের এই শিক্ষাকর্মী কেবল পড়াশোনা, শৃঙ্খলা বা আদব-কায়দা কচি–কাঁচাদের শিখিয়ে খান্ত হননি। বেতনের সামান্য টাকা থেকে পিকনিকে নিয়ে যান। বাবিদার কথায়, ‘‘ওরা তো আমার সন্তানের মতো। ওদের জন্য খরচ করতে কুণ্ঠা বোধ করি না। সামান্যতেই ওরা কত খুশি।” আর এই এক ফালি হাসির টানেই তো রোজ তিনি সেন্টারে চলে আসেন। বাড়িতে স্বামী, ছেলে, শাশুড়িকে দেখা। অঙ্গনওয়াড়িতে অজস্র সন্তান। এই নিয়ে বেশ আছেন বাবিদা।

পাদপ্রদীপের বাইরে থাকা এমন একটা এলাকায় নিঃশব্দ বিপ্লবের কারিগরের উত্থানের কাহিনি পৌঁছে গিয়েছে প্রশাসনের কাছে। দেশের অন্যতম সেরা অঙ্নওয়াড়ি কর্মী হিসাবে গত ডিসেম্বরে তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। জেলা থেকে তাঁর কেন্দ্রটি মডেল সেন্টার হয়েছে। প্রচুর খেলনা পাওয়ার পাশাপাশি পরিকাঠামোগত সাহায্যও আসতে শুরু করেছে। নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী মানেকা গান্ধীর থেকে পুরস্কার পাওয়া বাবিদার চোখ আরও অনেক দূরে। সবার থাকবে ইউনিফর্ম, পরিচয়পত্র থাকবে। বাচ্চাদের রান্নার জন্য গ্যাস থাকবে। এসব হয়ে গেলেই তাঁর সংসার বোধহয় একেবারে পরিপূর্ণ। অঙ্গনও যে অনেক কিছু করা করা যায় তা নিজের মতো করে দেখিয়ে দিয়েছেন এই স্বপ্নসন্ধানী।

Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags