সংস্করণ
Bangla

প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে ওঁরা এখন স্বপ্নের উদ্যানে

22nd Sep 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

আর দশজনের মতো কাজ থেকে অবসর নিয়ে আরামে-বিশ্রামে বাকি জীবনটুকু কাটিয়ে দিতে পারতেন এন এস হেমা। কিন্তু চোখে যাঁর স্বপ্ন, তাঁকে ছোট্ট গন্ডিতে আটকে রাখবে কার সাধ্যি। প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েদের জীবন গড়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ছুটেই চলেছেন। ১৯৫৯ সালে যখন অ্যাসোসিয়েশন অব পিপল উইথ ডিজ্যাবিলিট (এপিডি)গড়েন হেমা সে সময় তাঁর বয়স মাত্র একুশ। কত ভাঙা গড়া এবড়ো খেবড়ো পথ, কত অজানা বাঁক পেরিয়ে আজ এপিডি-র বয়স ৫৬। আর হেমার? ৭৬। 

image


প্রতিবন্ধীরা যাতে জীবিকার সন্ধান পান সেজন্য তাঁর উদ্যোগে এপিডি-তে চালু হয়েছে উদ্যান পালনের কোর্স। হেমা বলেন, ‘প্রতিবন্ধকতা থাকে মনে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে তা ডিঙিয়ে যাওয়া যায়।’

তাই এই গল্পটা ঠিক কোনও একজনের স্বপ্ন সফল হওয়ার গল্প নয়। একটা গোষ্ঠীর জীবন বদলের গল্প। আর এই বদলের কারিগর হেমার সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন অব পিপল উইথ ডিজ্যাবিলিট (এপিডি)। উমরের উদাহরণটাই বরং ধরুন।

বয়স তখন মাত্র দশ। সে সময় দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু বাড়িতে যাদের ভাতই জোটে না, তাদের আবার ওষুধ-পথ্য! সঠিক চিকিৎসার অভাবে কর্নাটকের গাদাগের ছেলে উমর সাব আল্লা সাব নাদাফের দু’চোখের দৃষ্টি সেই যে আবছা হয়ে গেল, তা আর ভাল হয়নি। অতি ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তির উমর যোগ দিয়েছিলেন এপিডি-র উদ্যানপালন কোর্সে। উমর তখন স্নাতক। বেঙ্গালুরুর বিখ্যাত এক বানিজ্যিক সংস্থার সুদৃশ্য বাগান সাজানোর ভার পেলেন তিনি। বদলে গেল নুন আনতে পান্তা ফুরনোর জীবন।

এরকমই জুনজে গৌড়ার কাহিনি। পোলিও আক্রান্ত এই ছেলের এক্কেবারে পড়াশোনায় মন বসত না। স্কুলছুট। এপিডি-র উদ্যান পালন কোর্স জুনজের জীবনও বদলে দিয়েছে। এখন তিনি বেঙ্গালুরুর ডেকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের বাগান দেখভাল করেন।

উমর সাব, জুনজে গৌড়ারা একা নন। আরও কত প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়ে এপিডি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে উদ্যান পালনকে জীবনের পথ হিসেবে নিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।

image


শুরুর দিনগুলো

কংক্রিটের শহরে এক চিলতে সবুজ মানেই যেন কত নিশ্চিন্তি। মন ভালো করে দেওয়ার ঠিকানা। গাছ-গাছালিতে ভরা উদ্যানের আরও এক উপকারি দিক সামনে এল আজ থেকে বছর পঁয়ত্রিশ আগে। প্রতিবন্ধীদের উদ্যান পালনের কাজে জড়িয়ে শারীরিক এবং মানসিক বিকাশের চেষ্টা শুরু হয় ব্রিটেনের সমারসেটে। সাফল্য মিলল। বলা হল বৃক্ষ-লতা-উদ্ভিদ পরিচর্যার মধ্যে দিয়ে প্রতিবন্ধীদের সৃজনশীলতা গড়ে ওঠে। আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ১৯৮২ সালে অক্সফ্যামের ‘নিউজ লেটারে’ এ নিয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন ক্রিস আন্ডারহিল। ভাগ্যিস সে লেখা হেমার হাতে এসেছিল। তিনি ক্রিসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। চাইলেন পরামর্শ। ১৯৮৩ সালে ব্রিটেনের সমারসেট থেকে বেঙ্গালুরুর লিঙ্গরাজপুরমে এপিডি-র সদর দফতরে এলেন আরও এক মহারথী। পিটার ম্যাকফাইডিয়ান। দক্ষ উদ্যান পালক। ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিবন্ধীদের নিয়ে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা দীর্ঘ দিনের। পিটারের দাবি উদ্যান পালনকে ‘থেরাপি’ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।

সে বছর এপিডি-র সম্মেলনে তৈরি করা হল উদ্যান পালন প্রশিক্ষণের খসড়া। ইতিমধ্যে হেমা তৈরি করে ফেলেছেন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি। এবার জমি চাই। হেমার প্রস্তাব বিচার করে ১৯৮৬ সালে বেঙ্গালুরুর জীবন বিমা নগরে তাঁকে এক একর জমি দিল বেঙ্গালুরু ডেভলপমেন্ট অথরিটি। শুরু হয়ে গেল মানুষের জন্যে বাগান বানানোর উদ্যোগ।

কায়লাশানহাল্লিতে এপিডি-র হর্টিকালচার ট্রেনিং সেন্টার

কায়লাশানহাল্লিতে এপিডি-র হর্টিকালচার ট্রেনিং সেন্টার


চরৈবেতি ....

এক বছরের মধ্যেই জীবন বিমা নগরে তৈরি হল এপিডি-র আবাসিক উদ্যান পালন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। শিক্ষার্থীদের জন্য ডরমেটরি, গ্রিন হাউস, লাইব্রেরি, অভিজ্ঞ শিক্ষক – কী নেই। নেপথ্যে হেমা। বিপুল ব্যয়ভার সামলানোর দায়িত্ব তাঁর একার কাঁধে। সঙ্গে প্রতিবন্ধীদের দেখভাল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালনা। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় শেখানো হল গাছ-পালার নাম, বৈজ্ঞানিক শ্রেণি বিন্যাস। গাছের কলম এবং মাটি উর্বর করার পদ্ধতি। গাছের রোগ-ভোগ হলে কী ওষুধ দিতে হবে, তার নাম।


প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ক্লাসরুম

প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ক্লাসরুম


১৯৮৮ সালে বেরল প্রথম ব্যাচ। হেমা চাইছিলেন, প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েদের ‘সবুজ অভিযান’ সাধারণ মানুষ দেখুক। সেই থেকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফি-বছর হয়ে আসছে বার্ষিক উদ্ভিদ মেলা। অল্প দামে মেলে গাছের চারা, বীজ, সার। উদ্ভিদ মেলা কালক্রমে হয়ে উঠেছে প্রতিবন্ধীদের দক্ষতার বিজ্ঞাপন। ১০ মাসের কোর্স চলছে সাতাশ বছর ধরে। ২০১৩ সালে ধুমধাম করে হয়ে গেল জীবন বিমা নগরে উদ্যান পালন কোর্সের সিলভার জুবিলি।

এক একর জায়গা আর কতটুকু? জীবন বিমা নগরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে লাগল। সবুজ বৃক্ষের স‌ঙ্গে প্রতিবন্ধীদের সবুজ মন মিলিয়ে মিশিয়ে দিতে হলে চাই আরও জায়গা। হেমা স্বপ্ন দেখেন এপিডি-র প্রশিক্ষণ শিবির হয়ে উঠবে বিশ্বের সেরা। সহানুভূতি নিয়ে বাঁচার বদলে প্রতিবন্ধী ছেলে-মেয়েদের তিনি দিতে চান উন্নততর জীবন। নতুন জীবিকা। তারা স্বনির্ভর হোক, উপার্জন করুক। ২০০১ সালে কায়লাশানহাল্লির হেন্নুর রোড এপিডি-কে পাঁচ একর জমি দেয় কর্নাটক সরকার। হেমার স্বপ্ন যেন ডাল-পালা মেলে দিল।

ভাগাড়ে ফুটছে গোলাপ, মাথা দোলাচ্ছে জিনিয়া, সুরভিত করে রাখছে জুই। সবুজের ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছে নাম জানা না জানা অনেক পাখি। কায়লাশানহাল্লির আবর্জনার স্তূপ হেমার শুভেচ্ছার স্পর্শে অনন্য উদ্যানে বদলে গিয়েছে।

কায়লাশানহাল্লি একটা সময় ছিল আবর্জনা ফেলার জায়গা। এখন বিখ্যাত অর্কিডের জন্য। যত দূর চোখ যায় সবুজ, শুধুই সবুজ। থোকা থোকা ফুলের ঝাঁক। মনে হবে এতো স্বপ্নের ওয়েসিস। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মমতাময় পরিচর্যায় বীজ ফুঁড়ে বের হয় শিশু-উদ্ভিদ। ডাল-পালা ছাড়িয়ে সে কৈশোর থেকে পৌঁছে যায় দুর্দান্ত যৌবনে। জীবন বিমা নগরের মতো এখানেও উদ্ভিদ মেলা হয় প্রতি বছর।

এখনও পর্যন্ত কায়লাশানহাল্লির কেন্দ্র থেক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। প্রত্যেককে দেওয়া হয় রান্নার তালিম। জীবিকার তাগিদে বাড়ির বাইরে গেলে নিজের রান্নাতো নিজেকেই করতে হয়। তাই হেমার নির্দেশ, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে রান্না শিখতেই হবে।

এই সুবিশাল হর্টিকালচার ট্রেনিং সেন্টারের রাস্তায় সৌর আলো, বৃ্ষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা, কমিউনিটি কিচেন, আধুনিক ক্লাসরুম, ডরমেটরি, লাইব্রেরি। প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতে যেন অসুবিধা না হয় সেজন্য এর স্থাপত্য তৈরি করা হয়েছে বিশেষভাবে।

মহিলা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হেমা

মহিলা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে হেমা


মেলে দাও ‘ইচ্ছেডানা’

চাকরি জীবনে বেশ আছেন উমর সাব। ভালো আছে জুনজোগৌড়াও। কেউ আবার চাকরি না করে ফিরে যায় নিজের বাড়িতে। পড়াশোনাকে কাজে লাগিয়ে চাষ-আবাদ করে। ফলায় নতুন প্রজাতির ধান, গম। পক্ষীমাতার মতো এতদিন যাঁদের আগলে রেখেছিলেন হেমা‌, আজ তাঁরাই অনেকটা শক্ত-সামর্থ্য। চিনের প্রবাদ অনুযায়ী, তুমি যদি এক বছরের জন্য পরিকল্পনা কর তাহলে ধান ফলাও। সারা জীবনের কথা ভাবলে মানুষকে শিক্ষিত করে তোলো।

হেমা এবং তাঁর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি এগিয়ে চলেছেন অনন্ত পথ ধরে। এখনও অনেক কাজ বাকি। এখনও শয়ে-শয়ে প্রতিবন্ধী রয়েছেন সুযোগের অপেক্ষায়...।


Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags