সংস্করণ
Bangla

চন্দ্রশেখর ঘোষ দেখিয়ে দিলেন কীভাবে দাঁড়াতে হয়

Hindol Goswami
14th Sep 2015
Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share

দীর্ঘদিনের পরিচয়। শান্ত স্নিগ্ধ মানুষ চন্দ্রশেখর ঘোষ। আস্তে কথা বলেন। কিন্তু তাঁর কথায় ঝলসে ওঠে তাঁর আত্মবিশ্বাস।

বন্ধন ব্য়াঙ্কের উদ্বোধনে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি

বন্ধন ব্য়াঙ্কের উদ্বোধনে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি


মহম্মদ ইউনুসের আদলে ক্ষুদ্র ঋণদান সংস্থা থেকে গোটা দেশের স্ট্যান্ডিং ওবেশন পাওয়া বন্ধন আজ ব্যাঙ্ক। প্রথম বাংলার ব্যাঙ্ক। তাঁর হাত ধরেই রূপান্তরের স্বপ্ন দেখছে পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর মতই পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন চন্দ্রশেখর, সহায় সম্বলহীন। এগারো বছরের ছেলে। সঙ্গে বাবা মা আর পাঁচ ভাইবোন।

কীভাবে লড়াই করেছেন শৈশবের সেই দিনগুলোয় ঘরোয়া আড্ডায় বলছিলেন চন্দ্রেশখর বাবু। আত্মবিশ্বাসী চোখের কোণেও মুক্তোর দানার মতো ঝিকিয়ে উঠছিল জল।

কাঁটাতার পেরিয়ে এদেশে আসার পর দিশাহীন পরিস্থিতির কথা। বাবার ছোট্ট মিষ্টির দোকান খুলে বসার গল্প শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল যেন ঋত্বিক ঘটকের কোনও সাদাকালো মাস্টারপিস দেখছি। পড়াশুনোর ফাঁকে ফাঁকে চন্দ্রশেখর বাবু বাবার দোকানে সাহায্য করতেন। তখন তাঁর বয়স খুব বেশি হলে বারো বছর।

চন্দ্রশেখর ঘোষ

চন্দ্রশেখর ঘোষ


দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। কঠিন উত্থান পতনের ভিতর দিয়ে ছয় ভাইবোনের সংসারের নৌকো বয়েছেন খুব অল্প বয়স থেকেই। তাইবলে পড়াশুনোয় ইতি টানতে দেননি এই মেধাবী ছাত্র। ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্ট্যাটিসটিকস নিয়ে স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন। যোগ দিয়েছেন বাংলাদেশের বৃহত্তম বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকে। কাজের সূত্রেই আলাপ হয়েছে সংস্থার কর্ণধার ফজলে হাসান আবিদের সঙ্গে। একটা মানুষ কীভাবে একটা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন সেটা খুব কাছ থেকে চাক্ষুষ করার সুযোগ পেয়েছেন চন্দ্রশেখর। তখন থেকেই ভিতরে ভিতরে স্বপ্নটা দানা বাঁধছিল। এরই মধ্যে বাংলাদেশেরই আরেক কৃতী সন্তান মহম্মদ ইউনুস ক্ষুদ্র ঋণদান সংস্থা গ্রামীণ তৈরি করে গোটা পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের মানচিত্রটাকে উজ্জ্বল করে ধরেছেন। গরিবগুর্বো মানুষের নিত্যদিনের লাঞ্ছনার একটা স্থায়ী সুদূর প্রসারী সুরাহার পথ দেখিয়েছেন ইউনুস। গোটা উপমহাদেশের সমস্ত সংবেদনশীল মানুষের কুর্নিশ কুড়িয়েছেন। আর সেই প্রেরণার আঁচে ধীরে ধীরে নিজেকে ইস্পাত বানাচ্ছিলেন চন্দ্রশেখর ঘোষ।

১৯৯৭ সালে ফিরে এলেন কলকাতায়। প্রথমে পারিবারিক ব্যবসা সামলাতে শুরু করলেও খুব শিগগিরই অন্যান্য বেশ কয়েকটি এনজিওয় কাজ করেন। মাঠে ঘাটে ঘুরে টের পান পশ্চিমবঙ্গের গরিব মানুষের অসহায়তার হাল হকিকত। দারিদ্রের সঙ্গে তাঁর আশৈশব বাস। তাই দরিদ্রের মনের কথা বুঝতে বেশিদিন লাগেনি। ২০০০ সালে ভিলেজ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির কাজটা ছেড়েই দিলেন। আর বছর খানেকের মধ্যেই শুরু করলেন তাঁর নিজের সংস্থা। বন্ধন মাইক্রোফাইনান্স সোসাইটি।

এমন একটা সময় ছিল দিন রাত এক করে গ্রাম শহর মফঃস্বলে চরকির মত ঘুরপাক খেয়েছেন। ঘরে ঘরে গিয়ে গ্রামের মহিলাদের বুঝিয়েছেন ছোটো ছোটো ঋণ নিয়ে ব্যবসা করতে, আর ঋণ শোধ করে আরও বেশি টাকার ঋণ নিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবসা বাড়াতে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে অনেক রাতেই ফিরতে পারেননি। অনেক দিনই ঠিক ঠাক খাবার জোটেনি। কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছবার তাগিদকে কখনওই দূরে ঠেলেননি।

২০০১ সালে হাওড়া জেলার বাগনান আর হুগলির কোন্নগর থেকে যাত্রা শুরু করে গোটা রাজ্যের অলি গলি পাকস্থলি ঘুরে ফেলেছেন চন্দ্রশেখর ঘোষ। এখন দুহাজারেরও বেশি কার্যালয় রয়েছে বন্ধনের। মাত্র দুজন কর্মীকে নিয়ে শুরু করেছিলেন যাত্রা। দিনে দিনে তাঁর মানব বন্ধনের শৃঙ্খল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে ছুঁয়ে গেছে বন্ধন। শুধু পশ্চিমবঙ্গ কেন। গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে বন্ধনের নেটওয়ার্ক।


মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে ফোটাতে বন্ধন আজ ব্যাঙ্ক। গত ২৩ অগাস্ট আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন হয়ে গেল। আর এভাবেই চন্দ্রশেখর ঘোষ দেখিয়ে দিলেন সততা নিষ্ঠা আর পরিশ্রমে ভর দিয়ে কীভাবে দাঁড়াতে হয়।


Add to
Shares
0
Comments
Share This
Add to
Shares
0
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags