সংস্করণ
Bangla

চিরহরিত ৫০ পেরনো বর্ধমানের গাছ মাস্টার

18th Dec 2015
Add to
Shares
34
Comments
Share This
Add to
Shares
34
Comments
Share

দ্বারকা প্রসাদ গুপ্তাকে মনে আছে? অশোক কুমার অভিনীত খুবসুরত ছবির গাছ পাগল দ্বারকা প্রসাদ গুপ্তা! যার নেশা ছিল সুযোগ পেলেই সবাইকে গাছের কথা শোনানো। সিনেমার এই দ্বারকা প্রসাদকে খুঁজে পাওয়া যাবে বর্ধমানে। তিনি পেশায় স্কুল শিক্ষক। নাম অরূপ চৌধুরী। লোকে বলে ‘গাছ মাস্টার’। 

পরিবেশ বাঁচাতে নিজের উদ্যোগে আর নিজের গ্যাঁটের কড়ি খরচ করে প্রায় ২০ হাজার গাছ বিতরণ করেছেন এই চিরহরিত মাস্টারমশাই। নিজে লাগিয়েছেন প্রায় হাজার খানেক গাছ। সবুজায়নই তাঁর জীবনের লক্ষ্য। অরণ্য সপ্তাহের সাতদিনের হুজুগ নয়। প্রতিটি দিন, বছরভর গোটা বর্ধমান শহরজুড়ে তিনি সবুজ বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন।

image


ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি প্রেম। বিভিন্ন মাঠ ঘাট থেকে গাছ সংগ্রহ করে সযত্নে লাগাতেন বাড়ির বাগানে। তবে তা দিয়ে মন ভরত না। চারিদিকে সবুজ করার স্বপ্ন ছিল চোখে। নিজের হাতেই আশপাশটাকে সবুজ করতে মন চাইত। কিন্তু গাছ কেনার টাকা কোথায়? মুশকিল আসান হল ১৯৯৩ সালে। বর্ধমানের নাদনঘাট রামপুরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ইংরাজির শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করলেন। স্কুলের চাকরিটাই যেন তার স্বপ্ন জয়ের সিঁড়ি হয়ে উঠল। আগে যে ভাবনাটা ছিল অগোছালো, চাকরি পাওয়ার পর তা হয়ে উঠলো পরিকল্পনা মাফিক। বেতনের টাকায় গাছ কিনে ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষকে গাছ বিলি করতে শুরু করলেন।

সবুজায়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে তৈরি হল ব্লু প্রিন্ট। স্কুলে ছাত্রদের নিয়ে তৈরি করলেন ‘গ্রিন আর্থ মুভমেন্ট’ নামে একটি সংস্থা। যে সংস্থার কাজ হল বিভিন্ন জায়গায় বৃক্ষ রোপণ করা, পাশাপাশি সভা সেমিনারের মাধ্যমে সবুজায়নের প্রয়োজনীয়তা ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষকে বোঝানো। শুধুমাত্র বেতনের টাকা নয় গাছ বিতরণ করতে পরীক্ষার খাতা দেখার বাড়তি পারিশ্রমিকের টাকাও কাজে লাগল। তবে এ সব কিছুই নিজের এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। চাইছিলেন সবুজের বার্তাকে আরও ব্যাপক অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে। সেই ভাবনা রূপ দিতে ব্যবহার করলেন সোশ্যাল মিডিয়াকে। ফেসবুক পেজ ক্রিয়েট করে নাম দিলেন ‘ উই দা গ্রিন টিচার’। বর্তমানে দেশ বিদেশের ৪০ জন শিক্ষক বন্ধু এর সদস্য। সদস্যদের অরূপ বাবুর একটাই বার্তা – “বছরে দুটি গাছ দান করুন অথবা রোপণ করুন”।

স্কুল শিক্ষক অরূপ চৌধুরী কিভাবে গাছ মাস্টার হলেন? 

কোন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলেই গাছ হাতে হাজির হতেন অরূপ বাবু। সেখানে নিজের হাতে গাছ লাগিয়ে তবে ফিরতেন। আবার অনেক সময় গাছ উপহারও দিতেন। স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে সাধারণ পুরস্কারের সঙ্গে একটি করে গাছ দেওয়ার রীতি চালু করেন। এই প্রথা এখন নিজের স্কুল ছাড়িয়ে জেলার অন্যান্য স্কুলেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষকে গাছ সম্পর্কে সচেতন করতে স্কুল সংলগ্ন গ্রাম গুলিতে লাগাতার প্রচার চালান। তখন থেকেই গাছ পাগল এই শিক্ষক হয়ে ওঠেন ‘গাছ মাস্টার’। আরও একটি বিষয় তিনি নজির গড়েছেন। ২০১১ সালে রাজ্য সরকারের শিক্ষারত্ন পুরস্কার পান। পুরস্কারের ২৫ হাজার টাকা নিজে না নিয়ে গ্রিন ফান্ড নামে একটি তহবিল গড়ে সেখানে দান করেন। সেই টাকায় গাছ বিতরণ করা হয়। 

‘মানুষ একবার গাছ হও তুমি’ নামে বইও লিখেছেন। সম্প্রতি অরূপ বাবুর পদন্নতি হয়। পাশের একটি স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদ পান। কিন্তু তার প্রতি ছাত্র ছাত্রীদের ভালোবাসা এতটাই যে, ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধে তিনি প্রধান শিক্ষকের পদ ফিরিয়ে দেন। এবং থেকে যান নিজের স্কুলেই। এছাড়াও তিনি আদিবাসী ও দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়মুখী করতে এবং স্কুলছুটদের শিক্ষার মুল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে ২৯ জন শিক্ষককে নিয়ে তৈরি করেন ‘ ড্রপ আউট প্রিভেনশন ক্লাব’।

মরু বিজয়ের কেতন হাতে এগিয়ে চলেছেন গাছ মাস্টার। তার এক একটি পদক্ষেপে জন্ম নেয় শাল,সেগুন,সোনাঝুরি,মেহগনির মত অজস্র বৃক্ষ। একটি গাছ, একটি প্রাণ যে শুধু স্লোগান নয়,এটা যে বাস্তব- সে কথা প্রমাণ করেছেন অরূপ বাবু। বিশ্বজুড়ে সবুজ সৃজনের ব্রতই তার একমাত্র লক্ষ্য। একদিকে যখন সবুজ ধ্বংস করে নগর সভ্যতা এগিয়ে চলেছে তখন সবুজকে রক্ষা করার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন গাছ মাস্টার।

Add to
Shares
34
Comments
Share This
Add to
Shares
34
Comments
Share
Report an issue
Authors

Related Tags